Skip to main content

সত্যন্দ্রনাথ দত্ত।। ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দোচাতুর্য ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করো

সত্যন্দ্রনাথ দত্ত।। ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দোচাতুর্য ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ সেমিস্টার বাংলা মেজর।

        আমরা জানি যে,বাংলা কাব্যের ইতিহাসে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২–১৯২২) একটি অত্যন্ত প্রসংশনীয় ও স্বতন্ত্র নাম। রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক যুগে কাব্যচর্চা করেও তিনি নিজের এক নিজস্ব ভুবন নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। বাংলা ছন্দের রূপ নির্মাণে, শব্দের সুরঝংকার সৃষ্টিতে এবং নব নব মাত্রিক বিন্যাসে তাঁর দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। এই কারণেই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ‘ছন্দের জাদুকর’ বা ‘ছন্দোরাজ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। বিশেষত, বাংলা মাত্রাবৃত্ত (কলাবৃত্ত) ছন্দে তিনি যে বৈচিত্র্য, দুলুনি ও রূপদক্ষতা দেখিয়েছেন, তা বাংলা কাব্যসাহিত্যে চিরস্মরণীয়। আর সেখানে।

    • সত্যেন্দ্রনাথের ছন্দোচাতুর্য ও শব্দকলা য় দেখি-সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছন্দোচাতুর্যের মূল ভিত্তি ছিল তাঁর অসাধারণ শব্দচয়নএবং ধ্বনিময়তা। যেখানে আছে- শব্দ-সঙ্গীত ও অলংকার।সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, তদ্ভব ও খাঁটি দেশি শব্দের অপূর্ব মেলবন্ধনে তিনি শব্দের ভেতরে সুর সৃষ্টি করতেন। কোন শব্দের পর কোন শব্দ বসলে ছন্দের ঝংকার সবচেয়ে সুন্দর শোনাবে, তা তাঁর নখদর্পণে ছিল।শুধু তাই নয়-আছে-

      মিলের বৈচিত্র্য। চরণের শেষে প্রথাগত মিল ছাড়াও তিনি চরণের মাঝখানে (আন্তর-মিল বা এবং পর্বান্তিক মিলের জাদুকরী দেখিয়েছেন। এছাড়াও আছে নতুন ছন্দের উদ্ভাবন। ফরাসি ‘আলেকজান্দ্রাইন’ ছন্দ, ফারসি গজল ও রুবাইর ছন্দকে বাংলা ভাষার স্বভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে তিনি বাংলায় সফলভাবে প্রয়োগ করেন।

       •মাত্রাবৃত্ত (কলাবৃত্ত) ছন্দের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার।মাত্রাবৃত্ত ছন্দের মূল বৈশিষ্ট্য হলো-যুক্তবর্ণ যেখানেই থাকুক না কেন (মুক্ত বা বদ্ধ অবস্থা), তা স্বরান্ত বা ব্যঞ্জনান্ত হিসেবে ২-মাত্রার কালপরিমাণ গ্রহণ করে। সত্যেন্দ্রনাথ এই ব্যাকরণসম্মত প্রথাকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন না করে এর ভেতরে অভাবনীয় বৈচিত্র্য এনেছিলেন-

    ক) গতির সঞ্চার ও বিচিত্র দুলুনি।সাধারণত মাত্রাবৃত্ত ছন্দ গুরুগম্ভীর ও ধীর লয়ের কাব্যভাব প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হতো। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ প্রমাণ করেন যে, এই ছন্দেও দ্রুত গতি এবং চঞ্চল নাচন আনা সম্ভব। আর সেখানে আমরা 'পাল্কীর গান' কবিতায় দেখতে পাই-

   "পাল্কী চলে!/ পাল্কী চলে! /গগন তলে / আগুন জ্বলে!"

     এখানে ৪-মাত্রার পর্ববিন্যাসে মাত্রাবৃত্তের যে তীব্র গতি ও বাস্তব জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে, তা এক বিস্ময়কর সৃষ্টি।

     খ) লয় ও পর্বের সংকোচন-প্রসারণ।মাত্রাবৃত্তের পর্বকে ৪, ৫, ৬ বা ৭ মাত্রায় ভেঙে ভেঙে তিনি লয়ের বৈচিত্র্য তৈরি করেছেন। কখনো ৫ মাত্রার দ্রুত লয়, আবার কখনো ৭ মাত্রার বিলম্বিত লয়ে তিনি অদ্ভুত এক তাল সৃষ্টি করতেন। যেখানে আমরা'ঝরনা' কবিতায় দেখি-

 "ঝরনা! ঝরনা! / সুন্দরী ঝরনা! /তরল ঢালু / রূপের চোরমা..."

     গ) যুক্তবর্ণের প্রয়োগ ও সুরঝংকার।কলাবৃত্ত ছন্দে যুক্তবর্ণের সঠিক ব্যবহারের ওপর ছন্দের সংগীতময়তা নির্ভর করে। সত্যেন্দ্রনাথের কবিতায় যুক্তবর্ণের ঠাসবুনোনি পাঠ করার সময় কানে এক অপূর্ব সুরের তরঙ্গ তোলে। যেখানে আমরা দেখতে পাই যে-

      "ছিপ্‌খান্‌ তিন্‌ দাঁড় / তিন জন মাঝি, / ওচ্ছল জল ঘায় / নাও চলে মাঝি।"

       • চিত্ররূপময়তা ও দৃশ্যগ্রাহ্যতা।সত্যেন্দ্রনাথের ছন্দোচাতুর্য শুধু কানের জন্য ছিল না, তা চোখের সামনে ছবি ফুটিয়ে তুলত। অর্থাৎ ছন্দের তাল ও লয় শুনেই পাঠক বুঝে নিতে পারতেন দৃশ্যটি কেমন। 'পাল্কীর গান'-এ দুলুনির ছন্দ, 'দূরপাল্লা'-য় নৌকার দাঁড় টানার ছন্দ কিংবা 'ঝরনা'-য় জলপ্রপাতের ঝরঝর ধ্বনি—সবই ছন্দের চাল বা গতির মাধ্যমে মূর্ত হয়ে উঠত।

      সমালোচকদের দৃষ্টিতে ও সীমাবদ্ধতা।সত্যেন্দ্রনাথের এই ছন্দোচাতুর্যের প্রশংসা করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন-

"সত্যেন্দ্রনাথের ছন্দের উপর যে অধিকার ছিল, বাংলা সাহিত্যে তাহার তুলনা নাই... বাংলা ভাষার যে কতখানি শক্তি আছে, তাহাও তিনি দেখাইয়াছেন।"

       তবে আধুনিক সমালোচকরা অনেক সময় মনে করেন, সত্যেন্দ্রনাথ ছন্দের কারিগরি ও জাদুকরীতে যতটা মনোযোগী ছিলেন, গভীর ভাব বা জীবনদর্শনের দিকে তাঁর মনোযোগ কিছুটা কম ছিল। অর্থাৎ তাঁর কবিতায় রূপশিল্প বা ছন্দের কারুকাজ কখনো কখনো মূল ভাবনাকে ছাপিয়ে গিয়েছে।

          পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,ভাবের গভীরতা সম্পর্কিত সামান্য সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও বাংলা ছন্দের ইতিহাসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অবদান অসামান্য। প্রথাগত পয়ারের বাইরে গিয়ে মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে সজীব, প্রাণবন্ত, দ্রুতগামী ও বৈচিত্র্যময় করে তোলাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। ছন্দের গতি, সুর ও অলংকরণকে তিনি যেভাবে একসুতোয় গেঁথেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে তাঁকে চিরকাল ‘ছন্দের জাদুকর’ হিসেবেই স্মরণীয় করে রাখবে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয় ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং সাজেশন ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 •



Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...