Skip to main content

দলীয় ব্যবস্থা।। ভারতীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলগুলির ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।

দলীয় ব্যবস্থা।। ভারতীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলগুলির ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়,সপ্তম সেমিস্টার,রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর।।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,যেকোনো সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিরোধী দল হলো গণতন্ত্রের প্রহরী। ভারতের মতো একটি বিশাল ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে যেখানে বৈচিত্র্যময় মতামত বিদ্যমান, সেখানে শাসক দলকে স্বৈরাচারী হওয়া থেকে রক্ষা করতে এবং জনগণের অধিকার সুনিশ্চিত করতে বিরোধী দলের উপস্থিতি অপরিহার্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আইভর জেনিংসের মতে-          "যদি সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বজায় রাখতে হয়, তবে বিরোধী দলের অস্তিত্ব অনস্বীকার্য।"

       ভারতীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলগুলির ভূমিকায় আমারা দেখতে পাই যে,ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলি মূলতঃ নিম্নলিখিত দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন করে থাকে। আর সেই দায়িত্ব বা ভূমিকা হলো-

     •শাসক দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখাঃ বিরোধী দলগুলির প্রধান কাজ হলো সংসদীয় বিতর্ক, প্রশ্নোত্তর পর্ব (Question Hour), মুলতুবি প্রস্তাব (Adjournment Motion), এবং অনাস্থা প্রস্তাব (No-Confidence Motion)-এর মাধ্যমে সরকারকে অনবরত নজরদারিতে রাখা। এটি সরকারকে স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত রাখে।

     • বিকল্প নীতি ও কর্মসূচির প্রস্তাব উপস্থাপনঃ বিরোধী দল কেবল সরকারের সমালোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা সরকারের জনবিরোধী নীতির বিপরীতে বিকল্প জনমুখী নীতি ও রূপরেখা জনগণের সামনে তুলে ধরে। এটি ভোটারদের সামনে নির্বাচনে বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।

      •জনমত গঠন ও জনগণের দাবির প্রতিফলনঃ সংসদের ভেতরে এবং বাইরে (মিছিল, সভা ও আন্দোলনের মাধ্যমে) বিরোধী দলগুলি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও সামাজিক অন্যায়ের মতো বিষয়গুলিকে তুলে ধরে জাতীয় জনমত গঠন করে।

    •সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে গঠনমূলক ভূমিকাঃপাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (PAC)-র মতো গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিগুলির চেয়ারম্যান সাধারণতঃ বিরোধী দলের থেকেই মনোনীত হন। এর মাধ্যমে তারা সরকারি খরচের হিসাব ও খতিয়ান পরীক্ষা করে আর্থিক দুর্নীতি রোধে সক্রিয় ভূমিকা নেয়।

    •সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষাঃ ভারতের মতো বহু সংস্কৃতিভিত্তিক দেশে শাসক দল অনেক সময় সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সংখ্যালঘু বা আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলির দাবি উপেক্ষা করতে পারে। বিরোধী দলগুলি এই প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে।

•বিরোধী দলগুলির প্রধান সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি•

     অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও, ভারতীয় দলীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলগুলির কিছু গুরুতর অভ্যন্তরীণ ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। আর সেই সীমাবদ্ধতাগুলি হলো-

    •ঐক্যের অভাব ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনঃ ভারতে প্রধান বিরোধী দলগুলির মধ্যে মতাদর্শগত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধ এতই তীব্র যে তারা প্রায়শই একক শক্তিশালী শাসক দলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বিকল্প হিসেবে উঠে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়।

 •সুবিধাবাদী জোট ও গঠনমূলক সমালোচনার অভাবঃ অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলি নীতিগত বিরোধিতার বদলে শুধুমাত্র "সরকার বিরোধিতা"-র খাতিরে বিরোধিতায় লিপ্ত হয়। গঠনমূলক বিকল্প প্রস্তাব দেওয়ার পরিবর্তে কেবল সংসদ অচল করা বা হইচই করার নীতি গ্রহণ করায় তাদের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায়।

     •সংগঠনের দুর্বলতা ও নেতৃত্ব সংকটঃজাতীয় স্তরে একটি সর্বজনগ্রাহ্য ও শক্তিশালী নেতৃত্বের অভাব বিরোধী পক্ষকে দুর্বল করে রেখেছে। বহু বিরোধী দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব এবং বংশানুক্রমিক রাজনীতি (Dynastic Politics) তাদের সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে বাধা দেয়।

     •আঞ্চলিক ও জাতীয় স্বার্থের সংঘাতঃ অনেক বিরোধী দল মূলতঃ আঞ্চলিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা, বিদেশনীতি বা সার্বিক অর্থনৈতিক ইস্যুতে তাদের সর্বভারতীয় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি হয় না।

 •সংবাদমাধ্যম ও নির্বাচনী সম্পদের বৈষম্যঃ সাম্প্রতিক সময়ে শাসক দলের তুলনায় বিরোধী দলগুলির কর্পোরেট ফান্ডিং এবং প্রচারমাধ্যমের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য দেখা যায়, যা তাদের গণতান্ত্রিক লড়াইকে আরো কঠিন করে তোলে।

      পরিশেষে বলা যায় যে, সুস্থ ও সফল গণতন্ত্রের জন্য একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল এবং দিকনির্দেশক বিরোধী দল অপরিহার্য। ভারতের বিরোধী দলগুলির মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও নীতিগত অস্পষ্টতার মতো কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, সরকারের একচ্ছত্র আধিপত্যকে প্রতিহত করতে এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বিরোধী দলগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.




Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...