Skip to main content

বইপড়া।।প্রমথ চৌধুরী কেন লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের চেয়ে উঁচুতে স্থান দিয়েছেন? তৎকালীন সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে তাঁর এই যুক্তির সার্থকতা আলোচনা করো।

বইপড়া।।প্রমথ চৌধুরী কেন লাইব্রেরিকে স্কুল-কলেজের চেয়ে উঁচুতে স্থান দিয়েছেন? তৎকালীন সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে তাঁর এই যুক্তির সার্থকতা আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর।।

      আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা গদ্য সাহিত্যের দিকপাল প্রমথ চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত ‘বই পড়া’ প্রবন্ধে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরে স্বশিক্ষার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন-"আমার মনে হয় যে, কাব্যচর্চার জন্য নয়, কেবল শিক্ষালাভের জন্যও লাইব্রেরির স্থান স্কুল-কলেজের ওপর হওয়া উচিত।" তৎকালীন ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও মুক্তচিন্তার বিকাশের স্বার্থেই তিনি এই ধারণা উপস্থাপন করেন। আর সেই ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে স্কুল-কলেজের চেয়ে লাইব্রেরিকে উঁচুতে স্থান দেওয়ার কারণসমূহ হলো-

     •বাধ্যবাধকতা বনাম স্বতঃস্ফূর্ত স্বাধীনতা।স্কুল-কলেজে শিক্ষার ওপর নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম, নিয়মকানুন ও পরীক্ষার চাপ চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে সেখানে শিখন প্রক্রিয়াটি যন্ত্রবৎ ও বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। কিন্তু লাইব্রেরিতে কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না; সেখানে পাঠক নিজের রুচি ও আগ্রহ অনুযায়ী স্বতঃস্ফূর্তভাবে জ্ঞানচর্চা করতে পারে।তাই দরকার -

      •'সুস্থ মন' গঠন ও স্বশিক্ষা।প্রমথ চৌধুরীর মতে, প্রকৃত শিক্ষা কেউ কাউকে দিতে পারে না-শিক্ষা অর্জন করতে হয় নিজ চেষ্টায়, অর্থাৎ স্বশিক্ষায়। স্কুল-কলেজ বড়জোর বিদ্যা 'গিলিয়ে' দিতে পারে, কিন্তু তা হজম করার শক্তি দেয় না। লাইব্রেরি হলো স্বশিক্ষার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ, যেখানে মানুষের মনের স্ফূর্তি ও স্বকীয় চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটে।যেখানে-

    •'মানসিক হাসপাতাল' হিসেবে লাইব্রেরি।প্রবন্ধকার লাইব্রেরিকে একপ্রকার "মানসিক হাসপাতাল"-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। শারীরিক ব্যাধির জন্য যেমন চিকিৎসালয় প্রয়োজন, তেমনি প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক চাপে মানুষের মনের যে ক্ষতি বা "অপমৃত্যু" ঘটে, লাইব্রেরি সেই ব্যাধিগ্রস্ত মনকে নিরাময় করে সঞ্জীবিত করে তোলে। আর সে কারণেই দরকার-

   • ডিগ্রি বনাম জ্ঞানার্জন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার মূল লক্ষ্য থাকে ডিগ্রি অর্জন এবং চাকরির যোগ্যতা অর্জন করা। সেখানে জ্ঞানকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, লাইব্রেরিতে মানুষ কোনো জাগতিক স্বার্থ ছাড়া কেবল মনের খোরাক জোগাতে এবং প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রবেশ করে।তবে-

      তৎকালীন সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে যুক্তির সার্থকতা হলো-তৎকালীন সমাজ ও ব্রিটিশ-শাসিত শিক্ষাকাঠামোর প্রেক্ষাপটে প্রমথ চৌধুরীর এই বক্তব্যটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ও সার্থক ছিল।ছিল-

       ঔপনিবেশিক শিক্ষার কদর্য রূপ।লর্ড মেকলে-প্রবর্তিত ব্রিটিশ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতে এমন একদল কেরানি তৈরি করা, যারা কেবল হুকুম তামিল করবে কিন্তু স্বাধীন চিন্তাভাবনা করতে পারবে না। স্কুল-কলেজগুলো সেই কেরানি তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছিল। এই যান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েই লেখক লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আর সেখানেই ছিল-

     •নোটভিত্তিক মুখস্থ বিদ্যা ও পরীক্ষার ভয়।তৎকালীন সমাজে পাসের হার ও পরীক্ষার সার্টিফিকেটকেই শিক্ষার মাপকাঠি ধরা হতো। ছাত্ররা না বুঝে নোট মুখস্থ করত এবং পরীক্ষার খাতায় তা উগরে দিত। প্রমথ চৌধুরী একে "বিদ্যার আবাহন না করে বিদ্যার আচমন করা" বলে কটাক্ষ করেছিলেন। এই নোট কালচারের হাত থেকে মুক্তি পেতে লাইব্রেরিতে মুক্ত বই পাঠের কোনো বিকল্প ছিল না। তবে আমাদের করার দরকার-

      ব্যাধিগ্রস্ত মানসিকতার চিকিৎসা।তৎকালীন বাঙালি সমাজ মনে করত স্কুল-কলেজের পড়াশোনাই শেষ কথা, সাহিত্যচর্চা বা বই পড়া এক প্রকার বিলাসিতা। প্রমথ চৌধুরী প্রমাণ করেন যে, এই সংকীর্ণ মানসিকতাই সমাজের ধ্বংস ডেকে আনছে। মনের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে স্বশিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন, আর তার একমাত্র ঠিকানা লাইব্রেরি।

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, প্রমথ চৌধুরী স্কুল-কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বর্জন করতে বলেননি; বরং তার অপূর্ণতাকে লাইব্রেরির মাধ্যমে পূর্ণ করার কথা বলেছেন। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় যে শিক্ষাপদ্ধতি আত্মিক বিকাশকে রুদ্ধ করেছিল, সেই শৃঙ্খল ভাঙার অস্ত্র হিসেবেই তিনি লাইব্রেরিকে সর্ব্বোচ্চ সম্মান দিয়েছিলেন। তাঁর এই চিন্তাধারা কেবল তৎকালীন সময়ের জন্যই নয়, বর্তমান পরীক্ষার চাপে পিষ্ট শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রাসঙ্গিক ও সার্থক।।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.




Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...