Skip to main content

ইসলামিক সাহিত্য।। মধ্যযুগের দেবমহাত্ম্যপূর্ণ কাব্য রচনা পরিবর্তে মানুষের রোমান্টিক প্রেমগাঁথা রচনা করলেন আরাকানের রাজসভার কবিরা- মন্তব্যটি বিচার করো।

ইসলামিক সাহিত্য।। মধ্যযুগের দেবমহাত্ম্যপূর্ণ কাব্য রচনা পরিবর্তে মানুষের রোমান্টিক প্রেমগাঁথা রচনা করলেন আরাকানের রাজসভার কবিরা- মন্তব্যটি বিচার করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর।

       আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগ মূলত দেবকেন্দ্রিক সাহিত্যধারার যুগ। মঙ্গলকাব্য, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কিংবা বৈষ্ণব পদাবলীতে দেবতার মাহাত্ম্য প্রচার ও অলৌকিকতাই ছিল কাব্য রচনার মূল অনুপ্রেরণা। এই ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে সপ্তদশ শতকে আরাকান (রোসাঙ্গ) রাজসভার কবিরা কাব্যের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেবকাহিনীর পরিবর্তে মর্ত্যের মানুষের রক্ত-মাংসের রূপ, আবেগ ও প্রেমকে প্রতিষ্ঠা করেন।যেখানে -

       বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে মূলভূখণ্ডের সাহিত্য পরিবেশ ছিল দেবতাকেন্দ্রিক। চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল বা ধর্মমঙ্গলের মতো কাব্যে দেখা যায়, দেব-দেবীর কৃপা বা কোপ লাভই ছিল কাহিনীর প্রধান বিষয়। মানুষের সুখ-দুঃখ, ন্যায়-অন্যায় বা প্রেমের মূল্য ছিল গৌণ। কিন্তু সপ্তদশ শতকে বঙ্গভূমির সীমানা ছাড়িয়ে আরাকান বা রোসাঙ্গ রাজসভায় এক সম্পূর্ণ নতুন সাহিত্যধারার জন্ম হয়। আরাকান রাজ্যটি ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে বাঙালি মুসলিম কবিদের এক মুক্ত চিন্তার পরিবেশ দান করেছিল। দরবারের পৃষ্ঠপোষকতায় কবিরা দেবমাহাত্ম্য রচনার পথ ত্যাগ করে মানবপ্রেমের গান গাইলেন।অতঃপর শুরু হয়-

    •দেবকেন্দ্রিকতা থেকে মানবকেন্দ্রিকতায় রূপান্তর।আরাকান রাজসভার কবিদের হাত ধরে বাংলা কাব্যে সর্বপ্রথম ধর্মনিরপেক্ষতা ও লৌকিকতার অনুপ্রবেশ ঘটে।আর সেখানে-

        দেবতার স্থলে মানুষের প্রতিষ্ঠা হয়।এই কবিরা কোনো অলৌকিক দেবী বা দেবতাকে কাব্যের কেন্দ্রে রাখেননি। তাঁদের কাব্যের নায়ক-নায়িকারা স্বর্গচ্যুত কোনো দেব-দেবী নন, তাঁরা এই পৃথিবীরই মানুষ। শুধু তাই নয়, সেইসাথে লৌকিক প্রেমের প্রাধান্য পেতে থাকে।ধর্মীয় অনুশাসন ও ভক্তির পরিবর্তে নর-নারীর রূপতৃষ্ণা, বিরহবেদনা, মিলনের আকুলতা এবং রোমান্টিক প্রেমই হয়ে ওঠে কাব্য রচনার মূল উপজীব্য।আর এই প্রেক্ষিতে-

        আরাকান রাজসভার ধারায় প্রথম ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি দৌলত কাজী। রাজপ্রধান আশরাফ খানের আদেশে তিনি মোল্লা সাধনের হিন্দি কাব্য অনুসরণ করে রচনা করেন ‘সতীময়না-লোরচন্দ্রানী’ (১৬২২-১৬৩৮)।যে কাব্যে নায়ক লোরক, প্রথমা স্ত্রী ময়না এবং দ্বিতীয় নারী চন্দ্রানীর ত্রিভুজ প্রেমকাহিনী বর্ণিত হয়েছে।তবে-

      মধ্যযুগীয় কাব্যে সচরাচর নারীদের পতিব্রতা রূপকে অলৌকিকতার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও, দৌলত কাজী এখানে প্রথমা স্ত্রী ময়নার বিরহবেদনা ও মানবীয় মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত বাস্তব ও জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।অতঃপর-

   আরাকান রাজসভার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি সৈয়দ আলাওল। আমাত্য মাগন ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে রচনা করেন তাঁর কালজয়ী কাব্য ‘পদ্মাবতী’ (১৬৪৬)।যেখানে চিতোরের রানা রত্নসেন ও সিংহল রাজকন্যা পদ্মাবতীর প্রেম, বিরহ ও মিলনের গাথা এতে বর্ণিত হয়েছে।আর সেই ভর্ণার মধ্যে-

     কাব্যে মানবিক প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভূতি, সৌন্দর্যচেতনা ও রূপবর্ণনা প্রাধান্য পেয়েছে। আলাওলের অন্যান্য রোমান্টিক রচনার মধ্যে ‘সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল’ ও ‘হপ্তপয়কর’ উল্লেখযোগ্য।আসলে-

       আরাকান রাজসভার কবিরা মৌলিক কাহিনীর চেয়ে মূলত ফারসি ও হিন্দি সুফি বা লৌকিক প্রেমের কাব্যকে ভিত্তি করে বাংলায় রূপান্তর করেছিলেন। তবে এই অনুবাদ স্রেফ আক্ষরিক ছিল না; তাতে বাঙালি জীবন, সংস্কৃতি ও আবেগ যুক্ত হয়ে তা মৌলিক সাহিত্যের রূপ নেয়।যেখানে দেখা যায় -

    মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও প্রাকৃতিক সংযোগ প্রেমগাথা গুলোতে চরিত্রগুলোর মানসিক দ্বন্দ্ব, উৎকণ্ঠা ও নায়িকাদের ‘বারমাস্যা’ (বারো মাসের দুঃখের বর্ণনা) অত্যন্ত মানবিক স্পর্শে চিত্রিত হয়েছে। প্রকৃতি এখানে দেবতার আজ্ঞাবহ নয়, বরং প্রেমিকের বিরহ বা মিলনের সঙ্গী।তবে-

          প্রচলিত মঙ্গলকাব্যের মতো এতে আকাশবাণী, দেবদেবীর হঠাৎ বরদান বা অভিশাপের মাধ্যমে কাহিনীর মোড় ঘোরানোর প্রবণতা অত্যন্ত কম। কার্যকারণ সম্পর্কের মাধ্যমে মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও ভাগ্য কাহিনীর গতি নির্ধারণ করেছে। তখন আরাকান রাজসভার কবিরা সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করলেন মানুষের হৃদয়ের প্রেমকে। সৈয়দ আলাওল বা দৌলত কাজীর হাত ধরে বাংলা সাহিত্য দেবালয় থেকে বের হয়ে মানুষের মর্ত্যীয় সংসারে এসে দাঁড়াল।

       পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, আরাকান রাজসভার কবিরা ছিলেন বাংলা সাহিত্যে আধুনিক মানবতাবাদের অগ্রদূত। মধ্যযুগের আচ্ছন্ন দেবকেন্দ্রিক ভাবধারা ভাঙার যে সাহসী সূচনা তাঁরা করেছিলেন, তা-ই পরবর্তীকালে আধুনিক যুগের মানবিক ও রোমান্টিক সাহিত্য রচনার পথ প্রশস্ত করেছিল। সুতরাং, মধ্যযুগের দেবমহাত্ম্য রচনার বিপরীতে মানুষের রোমান্টিক প্রেমগাথা রচনার যে কৃতিত্ব আরাকানের কবিদের দেওয়া হয়, তা ইতিহাসের সত্যতায় পূর্ণাঙ্গভাবে বিচার্য ও যথার্থ।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...