রায়তের কথা।। সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী সমাজ বীক্ষার অন্যতম পরিচয় 'রায়তের কথা' প্রবন্ধটি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনা শুরুতেই বলে রাখা ভালো যে,বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক ও ‘সবুজ পত্র’ পত্রিকার সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী (ছদ্মনাম ‘বীরবল’) ছিলেন আধুনিক বাংলা গদ্যের অন্যতম পথপ্রদর্শক। প্রমথ চৌধুরীকে সাধারণত নাগরিক মননশীলতা, মার্জিত বুদ্ধিমত্তা ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-কৌতুকের লেখক হিসেবে গণ্য করা হলেও, তাঁর ‘রায়তের কথা’ (১৯২৬) প্রবন্ধগ্রন্থে তাঁর সমাজবীক্ষার এক অনন্য, দরদী ও গভীর আর্থ-সামাজিক দিক উন্মোচিত হয়েছে। আর সমাজবীক্ষার আর্থসামাজিক দিকগুলি নিম্ন সূত্রাকারে আলোচনা করা হলো-
•জমিদারদের সমালোচনা ও রায়তদের দুর্দশা।প্রমথ চৌধুরী নিজে জমিদার পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও এই প্রবন্ধে বাংলার কৃষক বা রায়তদের ওপর হওয়া শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র সোচ্চার হয়েছেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) ফলে বাংলার সমাজে যে মধ্যস্বত্বভোগী ও অত্যাচারী জমিদার শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল, চৌধুরী মশায় তাদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলায়, অথচ তার লাভের সিংহভাগ হরণ করে নেয় জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।
•চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অসারতা।প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আসলে বাংলার কৃষকদের ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কেবল জমিদারদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। ইংরেজ সরকার ও দেশীয় জমিদারদের যৌথ স্বার্থ রক্ষায় সাধারণ ‘রায়ত’ বা কৃষক শ্রেণী কেবল শোষণের শিকারে পরিণত হয়েছে।
•রায়তের ভূমিস্বত্ব ও আইনগত অধিকার।‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধের প্রধান সুর হলো কৃষকদের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। প্রমথ চৌধুরী জোরালো দাবি তোলেন যে-
জমি যার, ফসল তার। আর সেখানে কৃষকই জমির প্রকৃত মালিক হওয়া উচিত। এরই পাশাপাশি খাজনা সংস্কার হিসেবে যথেচ্ছ খাজনা বৃদ্ধি ও বেআইনি আবওয়াব (উপকর) আদায় বন্ধ করতে হবে। শুধু তাই নয় আইনগত সুরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে কৃষকদের স্বার্থরক্ষায় আইনি সংস্কার ও নতুন প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরী।
•বাস্তবমুখী ও যুক্তিনির্ভর সমাজবীক্ষা।প্রমথ চৌধুরীর সমাজবীক্ষা আবেগ সর্বস্ব নয়, বরং তা অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর ও অর্থনীতিভিত্তিক। তিনি সমকালীন অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও আইনের ধারা বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন যে, কৃষককে দরিদ্র ও শোষিত রেখে একটি সমাজের বা দেশের সামগ্রিক উন্নতি কখনোই সম্ভব নয়। কৃষক সমাজ দেউলিয়া হলে পুরো দেশের অর্থনীতিই ভেঙে পড়বে।
•প্রগতিশীল চিন্তাধারা ও মানবতাবাদ।বীরবলী ভঙ্গির অন্তরালে এই প্রবন্ধে চৌধুরী মশায়ের এক গভীর মানবতাবাদী হৃদয় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি রায়তদের কেবল অর্থনৈতিক একক হিসেবে দেখেননি, তাদের মানুষ হিসেবে বাঁচার অধিকার ও আত্মমর্যাদার কথা বলেছেন। সমকালীন সাময়িকপত্রে ও বুদ্ধিজীবী মহলে এই প্রবন্ধ কৃষক সমস্যা নিয়ে এক নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,‘রায়তের কথা’ কেবল একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবন্ধ নয়, এটি প্রমথ চৌধুরীর সমাজভাবনার এক উজ্জ্বল দলিল। বাংলা সাহিত্যে অভিজাত শ্রেণীর লেখক হয়েও কৃষকদের অধিকার রক্ষায় তাঁর এই নির্ভীক গদ্য আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.
Comments
Post a Comment