Skip to main content

সমাজবিদ্যা। সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক আলোচনা করো।

সমাজবিদ্যা। সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্ক আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার সমাজবিদ্যা মাইনর। 

    শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,সমাজ ও সংস্কৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। সমাজবিজ্ঞানে এদের মুদ্রার দুই পিঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।যেখানে একটিকে ছাড়া অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। আর এই আলোচনা নিজেকে আমরা বলতে পারি যে-

       •• সমাজঃ সমাজ হলো সামাজিক সম্পর্কের একটি জটিল জাল (A web of social relationships)। মেকাইভার ও পেজ-এর মতে, সমাজ হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে মানুষের মধ্যে আন্তঃক্রিয়া, সহযোগিতা ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।আবার অন্যদিকে-

     •• সংস্কৃতি্ঃ সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবনযাত্রার প্রণালী (Way of life)। বিজ্ঞানী ই. বি. টাইলরের মতে, সংস্কৃতি হলো সেই জটিল সামগ্রিক রূপ যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি, আইন, প্রথা এবং সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষের অর্জিত অন্য যেকোনো দক্ষতা বা অভ্যাস।

২. সমাজ ও সংস্কৃতির পরিপূরক সম্পর্ক

১. দেহের সাথে প্রাণের সম্পর্ক: সমাজকে যদি মানুষের দেহের সাথে তুলনা করা হয়, তবে সংস্কৃতি হলো তার প্রাণ। সমাজ গঠন করে কাঠামোগত ভিত্তি (Structure), আর সংস্কৃতি যোগায় তার অন্তর্বস্তু (Content)।

২. ধারণকারী ও ধারণকৃত: সমাজ হলো সংস্কৃতি ধারক বা পাত্র। কোনো সমাজের অস্তিত্ব ছাড়া সংস্কৃতি টিকতে পারে না, আবার সংস্কৃতি ছাড়া কোনো মানবসমাজ গড়ে উঠতে পারে না।

৩. শিক্ষণীয় ও হস্তান্তরিত বিষয়: মানুষ জন্মসূত্রে কোনো সংস্কৃতি নিয়ে আসে না; সমাজ থেকেই মানুষ সংস্কৃতি শেখে (Soicalization process)। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সংস্কৃতির প্রচার ও বিস্তার সমাজেই ঘটে থাকে।

৩. সমাজ ও সংস্কৃতির পার্থক্য

সম্পর্ক গভীর হলেও এদের মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান:

| সূচক | সমাজ (Society) | সংস্কৃতি (Culture) |

|---|---|---|

| মূল বক্তব্য | সামাজিক সম্পর্কের কাঠামো ও মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়া। | মানুষের চিন্তাধারা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আচার-ব্যবহার। |

| রূপ | দৃশ্যমান বা কাঠামোগত দিক। | বস্তুগত (Material) ও অবস্তুগত (Non-material) উভয় রূপই থাকে। |

| প্রকৃতি | গতিশীল এবং মানবোত্তর প্রাণীদের মধ্যেও (যেমন: পিঁপড়ে, মৌমাছি) প্রাথমিক রূপ দেখা যায়। | শুধুমাত্র মানবসমাজের বৈশিষ্ট্য; শিক্ষণযোগ্য ও অর্জিত। |

৪. সমাজগঠনে সংস্কৃতির ভূমিকা

 * সামাজিকীকরণ (Socialization): সংস্কৃতি সমাজস্থ সদস্যদের মধ্যে সঠিক আচরণবিধি, নিয়মকানুন ও মূল্যবোধ গড়ে তোলে।

 * সামাজিক সংহতি (Social Cohesion): অভিন্ন সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য একটি সমাজের মানুষের মধ্যে একতা ও পারস্পরিক সংযোগ সৃষ্টি করে।

 * সামাজিক নিয়ন্ত্রণ (Social Control): সংস্কৃতির প্রথা, নীতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস সমাজের মানুষকে অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করা থেকে বিরত রাখে।

৫. সংস্কৃতি গঠনে সমাজের ভূমিকা

 * সংস্কৃতির পরিবর্তন ও বিকাশ: সমাজের পরিবর্তন হলে সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটে। সামাজিক প্রয়োজনই নতুন প্রযুক্তি, নিয়ম বা বিশ্বাসের জন্ম দেয়।

 * সংস্কৃতির সংরক্ষণ: সমাজ তার প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন: পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় কেন্দ্র) মাধ্যমে সংস্কৃতিকে ধরে রাখে এবং রক্ষা করে।

সমাজ এবং সংস্কৃতি দুটি ভিন্ন ধারণা হলেও বাস্তবে এরা একটি অপরটির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাই সমাজবিজ্ঞানী টি. বি. বটমোর বলেছেন, "সংস্কৃতি হলো সমাজেরই একটি প্রকাশ।" সংস্কৃতি ছাড়া সমাজ পশুপাখির দলের মতো দিশাহীন, আর সমাজ ছাড়া সংস্কৃতি অসার ও অস্তিত্বহীন।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...