Skip to main content

প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলন।।ভারতে প্রতিবাদীর ধর্ম আন্দোলন গড়ে ওঠার সামাজিক অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট আলোচনা করো।

প্রতিবাদী ধর্মীয় আন্দোলন।।ভারতে প্রতিবাদীর ধর্ম আন্দোলন গড়ে ওঠার সামাজিক অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম সেমিস্টার, ইতিহাস মাইনর। 

        আমরা জানি যে,প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী সময়।কারণ এই সময় গঙ্গারিডাই বা গাঙ্গেয় উপত্যকায় বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও তার জটিল আচার-অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় বিপ্লব সূচিত হয়, যা ‘প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন’ নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের ফলে জৈনধর্ম, বৌদ্ধধর্ম সহ প্রায় ৬২টি ভিন্ন মতবাদের উত্থান ঘটেছিল।আর সেখানে-

        প্রাচীন ভারতে প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট হিসেবে আমারা দেখতে পাই-খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলনের উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। তৎকালীন সমাজের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে পুঞ্জীভূত অসন্তোষই এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি রচনা করেছিল।

১. সামাজিক প্রেক্ষাপটঃ পরবর্তী বৈদিক যুগে সমাজে চতুর্বর্ণ প্রথা (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) অত্যন্ত কঠোর রূপ ধারণ করে। জন্মসূত্রে মানুষের সামাজিক মর্যাদা নির্ধারিত হতে শুরু করে। সমাজে ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয় এবং শূদ্রদের অবস্থান অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়।যার ফলে-

         সমাজে রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বর্ণপ্রথায় ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের নিচে অবস্থান করত। এই সামাজিক মর্যাদার দ্বন্দ্বে ক্ষত্রিয়রা ব্রাহ্মণদের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সচেষ্ট হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জৈনধর্মের প্রবর্তক মহাবীর এবং বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ-উভয়েই ছিলেন ক্ষত্রিয় বংশজাত।এছাড়াও-

          বৈদিক সমাজ কাঠামোর এই কঠোরতা ও চরম বৈষম্য সাধারণ মানুষের মনে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল, যা নতুন সহজ-সরল মতবাদের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করে।

২. অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটঃ খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গাঙ্গেয় উপত্যকায় লোহার ব্যবহারের ফলে কৃষিকাজে প্রভূত উন্নতি ঘটে। উদ্বৃত্ত কৃষি উৎপাদনকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য ও নগরায়ণের সূচনা হয় (যা ‘দ্বিতীয় নগরায়ণ’ নামে পরিচিত)। কৌশাম্বী, শ্রাবস্তী, রাজগৃহ ও বারাণসীর মতো সমৃদ্ধ নগর গড়ে ওঠে।যেখানে-

        দ্বিতীয় নগরায়ণের ফলে সমাজে বৈশ্য বা বণিক শ্রেণীর (সেঠি/শ্রেষ্ঠী) অর্থনৈতিক শক্তি ও গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বৈদিক বর্ণপ্রথায় তাদের সামাজিক স্থান ছিল ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের নিচে।যারফলে শুরু হয়-

       সুদের ব্যবসা ও সমুদ্রযাত্রায় বৈদিক নিষেধাজ্ঞা। ব্রাহ্মণ্যধর্ম সুদের বদলে অর্থ ঋণ দেওয়া (যাকে ‘কুসীদ’ বলা হতো) এবং সমুদ্রযাত্রাকে গর্হিত কাজ বলে মনে করত। এতে বণিকদের বাণিজ্য বিস্তারে বাধা সৃষ্টি হতো। অন্যদিকে বৌদ্ধ ও জৈনধর্ম বাণিজ্য, অর্থ বিনিয়োগ ও সমুদ্রযাত্রাকে সমর্থন করায় বৈশ্যরা এই নতুন ধর্মমতগুলোকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে।তবে-

        বৈদিক যজ্ঞে বলিদানের কারণে প্রচুর গবাদি পশু ধ্বংস হতো। অথচ কৃষিনির্ভর নতুন অর্থনীতিতে লাঙল চাষ এবং পরিবহনের জন্য বলদ ও গবাদি পশুর প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিসীম। জৈন ও বৌদ্ধধর্মের ‘অহিংসা’ নীতি পশুধন রক্ষায় সরাসরি সাহায্য করেছিল।

৩. ধর্মীয় প্রেক্ষাপটঃ বৈদিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও যজ্ঞ অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছিল। রাজসূয়, অশ্বমেধ বা বাজপেয় যজ্ঞ সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যায়।কারণ হিসেবে দেখা যায়-

          ধর্মীয় যজ্ঞের নামে হাজার হাজার পশু বলিদানের প্রথা সাধারণ মানুষের মনকে বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছিল। ধর্মের মানবিক দিকটি আচার-সর্বস্বতার নিচে চাপা পড়ে যায়।আবার অন্যদিকে-

           বৈদিক শাস্ত্র ও মন্ত্র সবই সংস্কৃত ভাষায় রচিত ছিল, যা ছিল সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। ব্রাহ্মণ পুরোহিত শ্রেণী ভাষার এই প্রাধান্যকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে শোষণ করত।এরই পাশাপাশি -

         পরবর্তী বৈদিক যুগের উপনিষদীয় দর্শনে ইতিমধ্যেই যজ্ঞ ও বাহ্যিক আচারের সমালোচনা করে জ্ঞানমার্গের কথা বলা হয়েছিল। এই চিন্তাধারা প্রতিবাদী আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি তৈরিতে সাহায্য করে।

     ৪. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটঃএই সময়ে ১৬টি মহাজনপদের উত্থান ঘটে। মগধ, কোশল, বৈশালী প্রভৃতি রাজ্যের শাসকরা ব্রাহ্মণ্য পুরোহিতদের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলেন।যারফল দেখা যায়-

       রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা। বিম্বিসার, অজাতশত্রু এবং পরবর্তীকালে প্রসেনজিতের মতো প্রভাবশালী নৃপতিরা বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মকে প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন, যা এই আন্দোলনকে এক অভূতপূর্ব গতি প্রদান করে।

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন ছিল কেবল একটি ধর্মীয় বিপ্লব নয়, বরং তৎকালীন আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের এক অনিবার্য ফল। বৈদিক ধর্মের কঠোরতা, ব্রাহ্মণ্য আধিপত্য, পশুবলি এবং সামাজিক বৈষম্যের বিপরীতে জৈন ও বৌদ্ধধর্মের প্রচার করা অহিংসা, সামাজিক সমতা এবং সাধারণ মানুষের ভাষায় (পালি ও প্রাকৃত) ধর্মপ্রচারের রীতি সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। এই আন্দোলন প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এক নতুন মানবিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক চেতনার উন্মেষ ঘটায়।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...