Skip to main content

বৈশেষিক দর্শন।। বৈশেষিক দর্শন অনুসারে সামান্য কী? সামান্যের প্রকারভেদ উপযুক্ত উদাহরণসহ আলোচনা করো।

বৈশেষিক দর্শন।। বৈশেষিক দর্শন অনুসারে সামান্য কী? সামান্যের প্রকারভেদ উপযুক্ত উদাহরণসহ আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর।

      আমরা জানি যে,বৈশেষিক দর্শন ভারতীয় দর্শনের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ বস্তুবাদী তথা বাস্তববাদী শাখা। মহর্ষি কণাদ এই দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। বৈশেষিক দর্শনে বিশ্বের সমস্ত জ্ঞেয় ও প্রমেয়(‘যা যথার্থ জ্ঞানের বিষয়’ বা ‘যাকে জানা যায়’)বস্তুকে সাতটি ‘পদার্থ’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে-দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় এবং অভাব।আর-

      এই সাতটি পদার্থের মধ্যে চতুর্থ পদার্থ হলো ‘সামান্য’। নিম্নে বৈশেষিক দর্শন অনুসারে সামান্যের লক্ষণ, স্বরূপ এবং এর প্রকারভেদ উপযুক্ত উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

     ১. সামান্যের লক্ষণ ও স্বরূপঃ সাধারণ ভাষায় সামান্য বলতে বোঝায় ‘জাতি’ বা ‘সাধারণ ধর্ম’ । বিশ্বের বহু বস্তুর মধ্যে যে অভিন্ন বা সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি বর্তমান থাকে, যার ফলে আমরা বিভিন্ন বস্তুকে একই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত বলে চিনতে পারি, তাকেই ‘সামান্য’ বলা হয়।যার-

    লক্ষণ হলো- প্রশস্তপাদ তাঁর ‘পদার্থধর্মসংগ্রহ’ গ্রন্থে সামান্যের লক্ষণ দিতে গিয়ে বলেছেন - যা নিত্য (যার উৎপত্তি বা বিনাশ নেই), যা এক (একটি একক তত্ত্ব) এবং যা অনেক বস্তুতে সমবায় সম্বন্ধে বর্তমান থাকে, তাকে সামান্য বলে। আর এই সামান্যের

     •প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ-

       •নিত্যত্বঃ বস্তু বা ব্যক্তির বিনাশ হলেও সামান্য বিনষ্ট হয় না। যেমন-সমস্ত মানুষের মৃত্যু হলেও ‘মনুষ্যত্ব’ জাতি বা সামান্য বিনষ্ট হয় না।

      •একত্ব্ঃ এই সামান্য ধর্ম বিভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তুতে অবস্থান করে। যেমন-লাখো লাখো গরুর মধ্যে ‘গোত্ব’ (Cowhood) জাতি বা সামান্য একটিই।

      •অনেকসমবেতত্বঃসামান্য ধর্মটি বহু ব্যক্তির মধ্যে ‘সমবায়’ বা নিত্য সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্ত থাকে।উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে-

       আমাদের সামনে যদি একাধিক লাল, কালো বা সাদা রঙের গরু থাকে, তবে তাদের আকার বা রঙ আলাদা হলেও সকলের মধ্যেই একটি সাধারণ ধর্ম বর্তমান থাকে—তা হলো ‘গোত্ব’। এই ‘গোত্ব’-ই হলো এখানে ‘সামান্য’।

২) সামান্যের প্রকারভেদ•বৈশেষিক দর্শনে ব্যাপকতা বা পরিমাণের তারতম্য অনুযায়ী সামান্যকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়-

১)পর সামান্য। ২. অপর-সামান্য। ৩. পরাপর-সামান্য।

      (ক) পর-সামান্যঃ যে সামান্যের দেশগত ও কালগত ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি এবং যা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বস্তুতে অবস্থান করে, তাকে ‘পর-সামান্য’ বলে।আর এটি হলো সর্বোচ্চ বা বৃহত্তম জাতি। বৈশেষিক দর্শনে ‘সত্তা’-কে একমাত্র ‘পর-সামান্য’ বলা হয়েছে।উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে-

      ‘সত্তা’ ধর্মটি সমস্ত ভাব-পদার্থের (দ্রব্য, গুণ ও কর্ম) মধ্যে বর্তমান। টেবিল, চেয়ার, মানুষ, রূপ, রস, গতি—সবার মধ্যেই ‘সত্তা’ বা ‘থাকা’ ভাবটি বিরাজমান। এর চেয়ে ব্যাপক আর কোনো সামান্য হতে পারে না।

      (খ) অপর-সামান্যঃ যে সামান্যের ব্যাপকতা সবচেয়ে কম এবং যা সবচেয়ে কম সংখ্যক বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাকে ‘অপর-সামান্য’ বলে।আসলে এটি হলো সর্বনিম্ন বা ক্ষুদ্রতম জাতি।উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে-

     ‘ঘটত্ব’ বা ‘পটত্ব’। ‘ঘটত্ব’ কেবল বিভিন্ন ঘটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, অন্য কোথাও থাকে না। সত্তার তুলনায় এর ব্যাপকতা অত্যন্ত কম।

      (গ) পরাপর-সামান্যঃ যা পর-সামান্যের (সত্তা) চেয়ে কম ব্যাপক কিন্তু অপর-সামান্যের (যেমন—ঘটত্ব) চেয়ে বেশি ব্যাপক, তাকে ‘পরাপর-সামান্য’ বলে।আসলে এটি হলো মধ্যবর্তী স্তরের সামান্য। এটি একটি অপেক্ষিক ধারণা-একটি নির্দিষ্ট সামান্যের তুলনায় এটি ‘পর’ (ব্যাপক) এবং অন্যটির তুলনায় ‘অপর’ (কম ব্যাপক)। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে-

       ‘দ্রব্যত্ব’বা ‘মনুষ্যত্ব’। ‘দ্রব্যত্ব’ ধর্মটি ‘সত্তা’-র চেয়ে কম ব্যাপক (কারণ এটি গুণ বা কর্মে থাকে না), তাই সত্তার কাছে এটি ‘অপর’।আবার-

       ‘দ্রব্যত্ব’ ধর্মটি ‘ঘটত্ব’ বা ‘পার্থিবত্ব’-এর চেয়ে বেশি ব্যাপক (কারণ এটি মাটি, জল, তেজ, বায়ু ইত্যাদি সব দ্রব্যে থাকে), তাই ঘটত্বের কাছে এটি ‘পর’।

৩. সামান্য ও অনুবৃত্তি-ব্যাবৃত্তি বুদ্ধি(এই অংশটুকু না লিখলে খুব বেশি সমস্যা হবে না )

     বৈশেষিক দর্শনে সামান্যের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য ‘অনুবৃত্তি ধারণা’ বা ‘অনুবৃত্তি বুদ্ধি’-র উল্লেখ করা হয়। আর সেখানে-

      •অনুবৃত্তি বুদ্ধিঃ"এটিও গরু, ওটিও গরু"-এই যে ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর মধ্যে একই প্রকার অভিন্ন প্রতীতি হয়, তা সামান্যের জন্যই সম্ভব হয়।

      •ব্যাবৃত্তি বুদ্ধিঃ সামান্য কেবল বস্তুকে অভিন্নরূপে চিনতে সাহায্য করে তা নয়, অন্যান্য জাতি থেকে তাকে আলাদা বা পৃথক  করতেও সাহায্য করে। যেমন ‘গোত্ব’ সামান্যের দ্বারাই গরুকে অশ্ব (ঘোড়া) থেকে পৃথক করা যায়।

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, বৈশেষিক দর্শনে সামান্য একটি বস্তুনিষ্ঠ এবং নিত্য পদার্থ। ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বৌদ্ধরা সামান্যের বাস্তব অস্তিত্ব স্বীকার করেন না (তাঁদের মতে সামান্য হলো ‘অপোহ’ বা মানসিক কল্পনা)। কিন্তু বৈশেষিক সম্প্রদায় প্রত্যক্ষ ও অনুমানের ভিত্তিতে সামান্যের স্বতন্ত্র বাস্তব অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন, যা তাঁদের বস্তুবাদী ও বাস্তববাদী দর্শনকে সুদৃঢ় ভিত্তি প্রদান করেছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...