Skip to main content

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ষোড়শ শতককে কেন স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন?

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ষোড়শ শতককে কেন স্বর্ণযুগ বলা হয় কেন? আলোচনা করো।

     বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ষোড়শ শতককে (১৫০১–১৬০০ খ্রিষ্টাব্দ) শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব ও চৈতন্যদেব-পরবর্তী সাহিত্যের এক অসামান্য বিকাশকাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সময়ের সাহিত্যিক সমৃদ্ধির কারণে একে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়।তর মূল কারণগুলো হলো-

      • চৈতন্যদেবের প্রভাব ও বৈষ্ণব সাহিত্য।ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্যদেবের উদার মানবতাবাদী বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রভাবে বাংলা সাহিত্য অপ্রতিরোধ্য গতি লাভ করে। তাঁর ভাবাদর্শ কেন্দ্র করে বাংলা ভাষায় প্রথমবারের মতো জীবনী সাহিত্য (যেমন-কৃষ্ণদাস কবিরাজের শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ও বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগবত) রচনার ধারা শুরু হয়।

     •বৈষ্ণব পদাবলীর চরম উৎকর্ষ।এই শতকে পদাবলী সাহিত্য ভাব, ভাষা ও রস পরিবেশনায় চরম শিখরে পৌঁছায়। বিদ্যাLine (পূর্বসূরি), জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের মতো কবিদের পদাবলীতে রাধাকৃষ্ণের প্রেমকে কেন্দ্র করে প্রেম ও ভক্তির অপূর্ব সুর ঝংকৃত হয়।

     •মঙ্গলকাব্যের রূপায়ন।ষোড়শ শতকেই মনসামঙ্গল ও চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রূপটি আত্মপ্রকাশ করে। বিশেষ করে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে সামাজিক জীবন, মানুষের সুখ-দুঃখ ও বাস্তব জীবনচিত্র অতুলনীয়ভাবে ফুটে ওঠে।

     •অনুবাদ সাহিত্যের বিস্তার।রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের অনুবাদ ও রূপান্তর এই সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে কাশীরাম দাসের মহাভারত ও পরমেশ্বর-শ্রীকর নন্দীর রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে।

    • লোকভাষার মর্যাদা ও মানবিকতার জয়গান।দেবদেবী-নির্ভর সাহিত্য থেকে সরে এসে সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে সাধারণ মানুষ ও মানবিক অনুভূতির স্থান তৈরি হয়। একই সাথে তৎসম শব্দের পাশাপাশি মার্জিত বাংলা লোকভাষার প্রয়োগ সাহিত্যকে নতুন মাত্রা দেয়।

      মোটকথা হলো-শ্রীচৈতন্যদেবের প্রভাবে বৈষ্ণব সাহিত্যের উদ্দীপনা, জীবনী কাব্যের সূচনা, বৈষ্ণব পদাবলী ও মঙ্গলকাব্যের চরম বিকাশ-সব মিলিয়ে ষোড়শ শতক বাংলা সাহিত্যকে এক অতুলনীয় উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল বলেই একে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...