বৈশেষিক দর্শন।।বৈশেষিক দর্শন মতে বিশেষ পদার্থ কী? এই বিশেষ পদার্থের লক্ষণ দাও। বিশেষ পদার্থকে স্বতন্ত্র পদার্থ রূপে স্বীকারের যুক্তি কী? আলোচনা করো।
বৈশেষিক দর্শন।।বৈশেষিক দর্শন মতে বিশেষ পদার্থ কী? এই বিশেষ পদার্থের লক্ষণ দাও। বিশেষ পদার্থকে স্বতন্ত্র পদার্থ রূপে স্বীকারের যুক্তি কী? আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার দর্শন মাইনর।
বিশেষ' পদার্থঃমহর্ষি কণাদ প্রণীত বৈশেষিক দর্শনে স্বীকৃত সাতটি পদার্থের (দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ, সমবায় ও অভাব) মধ্যে পঞ্চমে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাবপদার্থ হলো ‘বিশেষ’।অর্থাৎ-
বৈশেষিক মতে, যেসব নিত্যদ্রব্য (যেমন: নিত্য পরমাণু-পৃথিবী, অপ, তেজ ও বায়ুর পরমাণু এবং আকাশ, কাল, দিক, আত্মা ও মন) স্বতঃই সমান ও সদৃশ, সেগুলির একটিকে অপরটি থেকে আলাদা বা ভেদাভেদ নির্দেশ করার পরম গুণ বা ধর্মকেই ‘বিশেষ’ বলা হয়।মোট কথা হলো-
যে পদার্থ এক নিত্যদ্রব্যকে অপর নিত্যদ্রব্য থেকে পৃথক বা ব্যাবৃত্ত করে, তাকে ‘বিশেষ’ বলে। বৈশেষিক দর্শনের নামও এই ‘বিশেষ’ পদার্থটি স্বীকার করার জন্যই হয়েছে।
•বিশেষ পদার্থের লক্ষণঃ ন্যায় ও বৈশেষিক দার্শনিকদের মতে, বিশেষ পদার্থের লক্ষণগুলি নিম্নরূপ-
১. নিত্যদ্রব্যবৃত্তিত্ব অর্থাৎ নিত্যদ্রব্যে অবস্থানঃবিশেষ পদার্থ কেবল নিত্যদ্রব্যেই অবস্থান করে। কোনো অনিত্য দ্রব্যে (যেমন: কলসি, ঘর ইত্যাদি তৈরি বস্তুতে) বিশেষ পদার্থ থাকে না।
২. অত্যন্তব্যাবৃত্তিহেতুত্ব অর্থাৎ পরম পার্থক্যের কারণঃ বিশেষ পদার্থের কাজ হলো দুটি সমজাতীয় নিত্যদ্রব্যের মধ্যে চরম বা অত্যন্ত পার্থক্য গড়ে তোলা।
৩. স্বতোব্যাবর্তকত্ব অর্থাৎ নিজেই নিজের মাধ্যমে পৃথককারীঃ একটি বিশেষ পদার্থ অন্য একটি বিশেষ পদার্থকে পৃথক করার জন্য কোনো অতিরিক্ত দ্বিতীয় ধর্মের ওপর নির্ভর করে না; এটি নিজেই স্বতঃ-ব্যাবর্তক।তবে-
অন্নংভট্টের 'তর্কসংগ্রহ' অনুযায়ী লক্ষণ হলো- "নিত্যদ্রব্যবৃত্তয়ো বিশেষা ত্বনন্তা এব।" অর্থাৎ, নিত্যদ্রব্যে বর্তমান বিশেষ পদার্থগুলি সংখ্যায় অনন্ত বা অসীম। কারণ প্রতিটি পরমাণু ও নিত্যদ্রব্যের নিজস্ব স্বতন্ত্র ‘বিশেষ’ রয়েছে।
•বিশেষ পদার্থকে স্বতন্ত্র পদার্থ রূপে স্বীকারের যুক্তিঃ নৈয়ায়িক ও বৈশেষিকগণ বিশেষকে কেন গুণ বা সামান্য (জাতি)-র অন্তর্ভুক্ত না করে একটি স্বতন্ত্র বা ষষ্ঠ ভাবপদার্থ হিসেবে স্বীকার করেছেন, তার পেছনে প্রধান যুক্তিগুলি হলো-
(ক) নিত্য পরমাণুসমূহের পরম ভেদ বা পার্থক্য প্রমাণের জন্যঃ দুটি অনিত্য দ্রব্য (যেমন: দুটি মাটির ঘট) একই রকম দেখতে হলেও তাদের অবয়ব (তৈরির অংশ) বা আকারের পার্থক্যের দ্বারা তাদের চেনা যায়। কিন্তু দুটি তেজ বা জলের অতিসূক্ষ্ম নিত্য পরমাণু গুণ, রূপ ও আকারের দিক থেকে সম্পূর্ণ অভিন্ন। এখন প্রশ্ন ওঠে- একটি নির্দিষ্ট পরমাণু থেকে অন্য একটি নির্দিষ্ট পরমাণুকে কীভাবে আলাদা করে চেনা সম্ভব? বৈশেষিকরা যুক্তি দেন, প্রতিটি পরমাণুর মধ্যে একটি করে অতীন্দ্রিয় নিত্যধর্ম বা শক্তি বিদ্যমান, যাকে 'বিশেষ' বলে। এই 'বিশেষ'-এর জন্যই পরম সূক্ষ্ম স্তরেও পরমাণুগুলির নিজস্ব সত্তা আলাদা থাকে।
(খ) বিশেষ 'সামান্য' বা 'গুণ' হতে পারে না-
•সামান্য নয়ঃ'সামান্য' বা জাতি সব সময় বস্তুর মধ্যে 'অভিন্নতা' বা 'সাদৃশ্য' প্রকাশ করে (যেমন: সব মানুষের মধ্যে 'মনুষ্যত্ব')। কিন্তু 'বিশেষ' বস্তুর 'পার্থক্য' নির্দেশ করে। সুতরাং, সমজাতীয় ধর্ম প্রকাশকারী সামান্য এবং ভেদ প্রকাশকারী বিশেষ এক হতে পারে না।
• গুণ নয়ঃ গুণ কোনো দ্রব্যের ওপর আশ্রিত থাকে বটে, কিন্তু দুটি সমগুণসম্পন্ন নিত্য পরমাণুর গুণাবলীও একই হয়। তাই গুণ পরমাণুদ্বয়ের পার্থক্য নির্দেশ করতে পারে না।
(গ) অনবস্থা দোষ নিরাসঃ যদি বিশেষকে অন্য কোনো ধর্মের দ্বারা পৃথক করতে হতো, তবে সেই দ্বিতীয় ধর্মটিকে আবার তৃতীয় কোনো ধর্মের দ্বারা পৃথক করতে হতো—ফলে ‘অনবস্থা দোষ’ দেখা দিত। তাই বৈশেষিকরা যুক্তি দেন যে, বিশেষ পদার্থ নিজেই নিজেকে এবং তার আশ্রয়কে (পরমাণুকে) অপর বস্তু থেকে পৃথক করে।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,বৈশেষিক দর্শনে নিত্য পরমাণুসমূহের বৈচিত্র্য ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য রক্ষা করার জন্যই ‘বিশেষ’-কে একটি স্বতন্ত্র পদবাচ্য বা ভাবপদার্থ হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.
Comments
Post a Comment