বিশাল ডানাওয়ালা এক থুত্থরে বুড়ো।।গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘A Very Old Man with Enormous Wings’ (মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক অনূদিত: ‘বিশাল ডানাওয়ালা এক থুত্থরে বুড়ো’)
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, জাদুকরী বাস্তবতাবাদের (Magical Realism) একটি অনন্য নিদর্শন-বিশাল ডানাওয়ালা এক থুত্থরে বুড়ো নামক একটি আন্তর্জাতিক গল্প।সেই গল্পের অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেই গল্পে আমরা দেখি-
একটানা বৃষ্টির পর পেলাইও ও এলিসেন্দা দম্পতির উঠোনে কাদাজলে আছড়ে পড়ে ডানাওয়ালা এক বৃদ্ধ। দেখতে অদ্ভুত, করুণ ও জীর্ণ।গ্রামের এক বিজ্ঞ প্রতিবেশীর মতে সে আসলে একজন দেবদূত, যাকে অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে যেতে পাঠানো হয়েছিল। পেলাইও তাকে তাদের মুরগির খাঁচায় আটকে রাখে।খুব দ্রুতই এই অদ্ভূত বৃদ্ধের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাকে দেখার জন্য কৌতূহলী ও অন্ধবিশ্বাসী মানুষের ভিড় জমে।অতঃপর-
স্থানীয় যাজক ফাদার গনসাগা এসে পরীক্ষা করে দেখেন এবং সিদ্ধান্ত নেন-যেহেতু লোকটির লাতিন ভাষা জানা নেই এবং তাকে মহিমান্বিতও লাগছে না, সেহেতু সে দেবদূত না-ও হতে পারে।তবে ফাদার ভ্যাটিকানে চিঠি পাঠালেও চার্চের ধীরগতির আইনি ব্যবস্থার মাঝে মানুষ বৃদ্ধটির প্রতি আর আগ্রহী থাকে না।কারণ মেলায় এক 'মাকড়সা-নারী'র আগমন ঘটে, যার গল্প আরও রোমাঞ্চকর। পেলাইওরা দেবদূতকে প্রদর্শন করে অনেক টাকা উপার্জন করে একটি বড় বাড়ি তৈরি করে, কিন্তু লোকটির প্রতি কোনো মানবিক যত্ন নেয় না। অবশেষে বহু সময় পর, বৃদ্ধ লোকটির ডানা আবার গজায় এবং একদিন সে আনমনে আকাশে উড়ে চলে যায়।আসলে-
মানবিক নিষ্ঠুরতা ও স্বার্থপরতা এই গল্পে অনেক বড় হয়ে উঠেছে।অলৌকিক সত্তা হওয়া সত্ত্বেও মানুষ বৃদ্ধটিকে একমুহূর্তের জন্যও শ্রদ্ধা বা সমবেদনা জানায়নি। তাকে পশুর মতো মুরগির খাঁচায় রাখা হয়েছে, তার দিকে ছাই ছিটানো হয়েছে এবং তাকে একটি বাণিজ্য পণ্য বানিয়ে টাকা তোলা হয়েছে।তবে-
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা এ গল্পের প্রাণ।চার্চ এবং ধর্মীয় প্রতিনিধি (ফাদার গনসাগা) বৃদ্ধ লোকটির দুঃখবোধ বোঝার বদলে নিয়মকানুন, লাতিন ভাষা ও আমলাতান্ত্রিক তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অলৌকিকতাকে সংজ্ঞায়িত করতে ব্যস্ত, কিন্তু বিপন্ন সত্তাকে সাহায্য করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।কিন্তু -
অলৌকিক দৃশ্য দেখার জন্য মানুষের ভিড় যত দ্রুত জমেছিল, মাকড়সা-নারীর মতো নতুন কোনো আকর্ষণ আসার পর তা তত দ্রুতই উধাও হয়ে যায়।আসলে মানুষ সত্যের চেয়ে সস্তা বিনোদনকে বেশি প্রাধান্য দেয়।আর সেখানেই
গল্পের জাদুকরী বাস্তবতাবাদ (Magical Realism) জায়গা করে নেয়।গল্পের অবিশ্বাস্য অলৌকিক ঘটনা (ডানাওয়ালা লোক) এবং দৈনন্দিন বাস্তব জীবনের সাধারণ কদর্যতা একই সুতোয় বাঁধা। গল্পে ডানা থাকা সত্ত্বেও দেবদূতটি অত্যন্ত পার্থিব, অসুস্থ এবং জীর্ণ।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি, মানুষ যদি তার চোখ ও মন বন্ধ করে রাখে, তবে চোখের সামনে অলৌকিক বা অনন্য কিছু থাকলেও সে তা চিনতে পারে না। মানুষ কেবল নিজের স্বার্থ, অর্থ লাভ এবং তাৎক্ষণিক বিনোদনের পেছনে ছোটে।
Comments
Post a Comment