Skip to main content


পরিবেশ নীতিশাস্ত্র বলতে কী বোঝায়? পরিবেশ সুরক্ষায় নীতিশাস্ত্র কীভাবে সাহায্য করে?

 পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় সপ্তম সেমিস্টার দর্শন মাইনর সিলেবাস অনুসারে একটি তথ্যমূলক পরীক্ষার জন্য নোটস প্রয়োজন।



 উত্তর:

১. পরিবেশ নীতিশাস্ত্র (Environmental Ethics) বলতে কী বোঝায়?

পরিবেশ নীতিশাস্ত্র (Environmental Ethics) হলো ফলিত বা ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্রের (Applied Ethics) একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা, যা মানবজাতি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যকার নৈতিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করে।

সাধারণ নীতিশাস্ত্র যেখানে মূলত মানুষে-মানুষে আচরণ ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করে, পরিবেশ নীতিশাস্ত্র সেখানে মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিধিকে প্রসারিত করে অ-মানুষ প্রাণী, উদ্ভিদ, বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) এবং সমগ্র পৃথিবীর ওপর প্রয়োগ করে।

পরিবেশ নীতিশাস্ত্রের মূল বক্তব্য হলো—প্রকৃতি কেবল মানুষের স্বার্থসিদ্ধি বা ভোগের মাধ্যম নয়; প্রকৃতির নিজস্ব নৈতিক মূল্য (Intrinsic Value) রয়েছে। মানুষের উচিত প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে তার সংরক্ষণ করা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখা।

২. পরিবেশ সুরক্ষায় নীতিশাস্ত্র কীভাবে সাহায্য করে?

পরিবেশগত সংকট (যেমন: জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমি ধ্বংস, বিশ্ব উষ্ণায়ন) মূলত মানুষের দায়িত্বহীন আচরণ ও চরম ভোগবাদী মানসিকতার ফসল। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় নীতিশাস্ত্র নিম্নলিখিত উপায়ে ভূমিকা পালন করে:

ক) মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির (Anthropocentrism) পরিবর্তন:

ঐতিহ্যগতভাবে মানুষ মনে করত প্রকৃতির ওপর তার একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে। নীতিশাস্ত্র মানবকেন্দ্রিক এই অহংকারকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং পরিবেশকেন্দ্রিক (Biocentrism / Ecocentrism) দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে শেখায়।

খ) স্বকীয় বা অভ্যন্তরীণ মূল্য (Intrinsic Value) স্বীকার:

নীতিশাস্ত্র আমাদের শেখায় যে গাছপালা, নদী, পর্বত ও অন্যান্য প্রাণীদের মূল্য কেবল মানুষের ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না; তাদের স্বাধীন অস্তিত্ব ও মূল্য রয়েছে। এই উপলব্ধি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরাসরি সাহায্য করে।

গ) পরিবেশগত ন্যায়বিচার (Environmental Justice):

নীতিশাস্ত্র নিশ্চিত করে যে পরিবেশদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব যেন কেবল দরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর না পড়ে। এটি উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সম্পদ ব্যবহার ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব বণ্টনে সমতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়।

ঘ) অন্তর্বংশীয় ন্যায়বিচার (Intergenerational Justice):

নীতিশাস্ত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভবিষ্যতের প্রজন্মের প্রতিও আমাদের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। বর্তমানের অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ ব্যবহারের ফলে যেন ভবিষ্যতের মানুষের জীবন বিপন্ন না হয়, তা নিশ্চিত করতে এটি স্থায়ী উন্নয়ন বা টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)-এর নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

ঙ) পরিবেশ আইন ও নীতি প্রণয়নে নির্দেশনা:

সরকার বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যখন কোনো পরিবেশ আইন বা নীতি তৈরি করে, তখন নীতিশাস্ত্র সেখানে নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। যেমন—কোথাও শিল্পায়ন করতে গিয়ে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কতটুকু ক্ষতি গ্রহণযোগ্য, তার নৈতিক সীমা নির্ধারণ করে নীতিশাস্ত্র।

পরীক্ষার উপযোগী কিছু মূল পয়েন্ট (মনে রাখার জন্য):

 * সংজ্ঞা: মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যকার নৈতিক সম্পর্ক আলোচনার শাখা।

 * মূল উদ্দেশ্য: প্রকৃতিকে কেবল ভোগের বস্তু না ভেবে তার অভ্যন্তরীণ মূল্যকে সম্মান জানানো।

 * প্রয়োগ: পরিবেশ রক্ষা, বন সৃজন, পরিবেশ নীতি প্রণয়ন এবং টেকসই উন্নয়নে সহায়তা করা।

Environmental Ethics: Crash Course Philosophy #29

এই ভিডিওটিতে পরিবেশ নীতিশাস্ত্রের মূল ধারণা, মানবকেন্দ্রিক (Anthropocentrism) ও পরিবেশকেন্দ্রিক (Ecocentrism) দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এর নৈতিক গুরুত্ব সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা আপনার পরীক্ষার উত্তরের ধারণা আরও স্পষ্ট করতে সাহায্য করবে।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...