Skip to main content

চর্যাপদ।।র্যাপদের গূঢ় ধর্মীয় সাধনতন্ত্রের প্রকাশ ঘটলেও তারই মধ্যে গানগুলিতে তৎকালীন সমাজ জীবন যেভাবে পরিলক্ষিত হয় তার পরিচয় দাও।

চর্যাপদ।।র্যাপদের গূঢ় ধর্মীয় সাধনতন্ত্রের প্রকাশ ঘটলেও তারই মধ্যে গানগুলিতে তৎকালীন সমাজ জীবন যেভাবে পরিলক্ষিত হয় তার পরিচয় দাও।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর/মাইনর।।

      আমরা জানি যে,বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ মূলত সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ধর্মীয় সাধনসংগীত। সাধনমার্গের গূঢ় সংকেত ও সন্ধ্যাভাষার (সন্ধ্যাভাষা বা আলীয়-কালীয় ভাষা) আবরণে এটি রচিত হলেও, তৎকালীন বাস্তব সমাজচিত্রের প্রতিফলনে এটি অনন্য। সিদ্ধাচার্যরা তাঁদের অমূর্ত সাধনতত্ত্বকে বোঝাতে গিয়ে তৎকালীন বাংলার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের নানা রূপক ও চিত্রকল্প ব্যবহার করেছিলেন। ফলে চর্যাপদে দশম থেকে দ্বাদশ শতকের অবহেলিত ও নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের জীবনচ্ছবি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।আর সেখানে আমরা দেখি-

      •ভৌগোলিক পরিবেশ ও পেশাগত জীবন। চর্যাপদের সমাজ মূলত নদীমাতৃক বাংলার আবহমান জীবনধারাকে ফুটিয়ে তোলে। নদীর পাড়ে সাধারণ মানুষের বসবাস, নৌকা বা সাঁকো দিয়ে নদী পারাপার এবং দৈনন্দিন খেয়াঘাটের দৃশ্য এতে প্রচুর দেখা যায়।আর সেই চিত্রে আমরা দেখতে পাই-

      নৌকা ও পারাপার।চর্যাকার ডুম্বীপা, কামলীপা প্রমুখ নৌকা চালনা ও নদী পারাপারের রূপক ব্যবহার করেছেন। খেয়া পারাপারের জন্য কড়ি বা মাশুল দেওয়ার কথা বলা হয়েছে- "মাঙ্গতে নাবা খাট না হী।"আছে-

      •নানা পেশার মানুষ।চর্যায় সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের বৈচিত্র্যময় পেশার পরিচয় মেলে। শিকারি, ব্যাধ (শবর), জেলে (ডোম), তুলা ধুনকার, তাঁতি, শুঁড়ি (মদ প্রস্তুতকারক) এবং কাঠের কাজ করা মানুষদের জীবনচর্যা এতে উঠে এসেছে। যেমন বিরুআপা শুঁড়িশাল ও মদ বিক্রির বর্ণনা দিয়েছেন-"এক সে শুণ্ডিনী দুই ঘরে সন্ধানা।"

     •অর্থনৈতিক সংকট ও দারিদ্র্যের চিত্র।চর্যাপদে ফুটে উঠেছে তৎকালীন নিম্নবিত্ত মেহনতি মানুষের চরম দারিদ্র্যের করুণ দৃশ্য। শাসক ও উচ্চবর্ণের চাপে সাধারণ মানুষের জীবন ছিল অনিশ্চিত।তাই দরিদ্রের হাঁড়ি স্বরূপ টেঁন্ডণপাদের ৩৩ নম্বর চর্যায় দারিদ্র্যের যে জীবন্ত ও মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কালজয়ী-

    "টালত ঘর মোর নাহি পরবেসী। / হাঁড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেসী॥"

         অর্থাৎ, পাহাড়ের টিলায় একা আমার ঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই; অথচ হাড়িতে ভাত নেই, কিন্তু প্রতিদিনই প্রেমিকের (বা অতিথির) আগমন ঘটছে।এছাড়াও তাদের জীবনসংগ্রামে দেখা যায়,অন্নবস্ত্রের অভাব এবং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার জন্য যে কঠোর সংগ্রাম, তা চর্যাকাররা অত্যন্ত সহানুভূতি ও প্রত্যক্ষদর্শীর চোখে উপস্থাপন করেছেন।শুধু তাই নয়-

       সামাজিক শ্রেণিভেদ ও অস্পৃশ্যতা চর্যাপদের একটি মৌলিক বিষয়।তাই আমরা দেখতে পাই-তৎকালীন সমাজে বর্ণপ্রথা ও শ্রেণিভেদ ছিল অত্যন্ত প্রকাট। ডোম্বা, শবর, চণ্ডাল প্রভৃতি নিম্নবর্ণের মানুষরা সমাজের মূলধারার বাইরে বা নগরের প্রান্তে বসবাস করত।আর সেখানে কান্হপাদের ১০ নম্বর চর্যায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে নিম্নবর্ণের নারীর অবহেলিত অবস্থান-

    "নগর বাহিরে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ। / ছোই ছোই জাসি বাম্‌হণ নাড়িআ॥"

         অর্থাৎ, হে ডোমনী, নগরের বাইরে তোমার কুঁড়েঘর; তুমি ব্রাহ্মণ নেড়াদের ছুঁয়ে স্পর্শ করে চলে যাও।যা উচ্চবর্ণের জন্য নিষিদ্ধ ছিল।তবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও এই অন্ত্যজ মানুষদের নিজস্ব আনন্দ, গান ও উৎসব ছিল।

    পারিবারিক ও নারী জীবন।চর্যাপদে তৎকালীন পারিবারিক সম্পর্কের মধুরতা ও জটিলতা দুই-ই স্থান পেয়েছে। শাশুড়ি, ননদ, বুনিয়া (ভাদৌ বা ভাসুর) প্রমুখ পারিবারিক চরিত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। কামলীপার একটি পদে সংসার ও তার মায়াজালকে শাশুড়ি মেরে ফেলার রূপকে দেখানো হয়েছে-"মেটেলী তাছী বাপ ঘুড়ি ঘেলি।"

      •নারীর রূপ ও অলংকার।ডোম্বী ও শবরী নারীদের সাজসজ্জা এবং রূপবর্ণনা পাওয়া যায়। শবরী ময়ূরপুচ্ছের পোশাক পরত এবং কানে গুঞ্জাফলের মালা বা অলংকার ধারণ করত-"কাণে কুণ্ডল বহী সেহী।" কুক্কুরীপাদের পদে যৌতুক প্রথা ও বিয়ের রীতি-রীতির কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

    •বিনোদন, ক্রীড়া ও লোকসংস্কৃতি।দরিদ্র হলেও তৎকালীন সাধারণ মানুষের বিনোদনের উপকরণের অভাব ছিল না। চর্যায় ডোমনী বা শবরীদের নাচ ও গানের কথা বলা হয়েছে। বুসুকুপা এবং কান্হপার পদে দেখা যায়, বীণা বা মাদল বাজিয়ে নাচ-গানের অনুষ্ঠান হতো "অণহা ডমরু বাজএ বীর নাদে।"এছাড়াও তৎকালীন সমাজে ‘বুদ্ধনাটক’ বা লোকনাটকের প্রচলন ছিল।

        মানুষ অবসর সময়ে পাশা বা দাবা খেলায় মেতে উঠত। প্হা এবং গহিন পদে দাবা খেলার বিভিন্ন পারিভাষিক শব্দ (যেমন: রাজা, মন্ত্রী, গজ, পদাতিক) ব্যবহার করে সাধনতত্ত্ব বোঝানো হয়েছে।

      •আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি।তৎকালীন সমাজের চোর-ডাকাতের ভয় এবং আইন-শৃঙ্খলার কিছু খণ্ডচিত্র চর্যাপদে পাওয়া যায়।রাতের বেলা চোরের উপদ্রব ছিল। চোর গৃহস্থের ঘরে সিঁধ কেটে চুরি করত।সেখানে কুক্কুরীপাদের পদে বলা হয়েছে, বধূরা রাতে জেগে থাকত এবং চোরের ভয়ে সতর্ক থাকত— "রাতিঅই চোরী সিআলেঅ খাঅ।

       পরিশেষে বলতে পারি যে, সিদ্ধাচার্যদের মূল উদ্দেশ্য কোনো ইতিহাস বা সামাজিক দলিল রচনা করা ছিল না; তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় চেতনা ও সাধনপদ্ধতি প্রকাশ করা। কিন্তু প্রতীক ও রূপক চয়নের জন্য তাঁরা যে সমাজ থেকে উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন, তা তৎকালীন সমাজবাস্তবতার এক খাঁটি ছবি তৈরি করেছে। উচ্চবর্ণের সাহিত্য যখন দেবদেবীর স্তুতিতে ব্যস্ত ছিল, তখন চর্যাপদের কবিরাই প্রথম সাধারণ মানুষ, তাঁদের দুঃখ-কষ্ট, উৎসব ও যাপনকে সাহিত্যের আঙিনায় এনে দাঁড় করান। তাই চর্যাপদ কেবল বাংলা ভাষার প্রথম সাহিত্যিক রূপই নয়, তৎকালীন সমাজ-ইতিহাসের এক অনবদ্য আকর গ্রন্থ।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...