Skip to main content

বর্ষা। প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ সংগ্ৰহের বর্ষা প্রকৃতি মানবের প্রাণে যে সজীবতা ও আনন্দানুভূতির সঞ্চার করে তা 'বর্ষা' প্রবন্ধে কিভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে? আলোচনা করো।

বর্ষা।। প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধ সংগ্ৰহের  বর্ষা প্রকৃতি মানবের প্রাণে যে সজীবতা ও আনন্দানুভূতির সঞ্চার করে তা 'বর্ষা' প্রবন্ধে কিভাবে  অভিব্যক্ত হয়েছে? আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর।

          আমরা জানি যে,বাংলা গদ্যরীতির অন্যতম জনক প্রমথ চৌধুরীর ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ’ গ্রন্থভুক্ত ‘বর্ষা’ প্রবন্ধটি বর্ষার রূপ-সৌন্দর্য, রোমান্টিকতা এবং মানবমনে তার সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের এক অনন্য দলিল। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে প্রকৃতির যে শুষ্কতা তৈরি হয়, বর্ষার আগমনে তা মুহূর্তে ধুয়ে মুছে যায়। প্রমথ চৌধুরী তাঁর নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত চিন্তাধারা ও মননশীল রীতির মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন কীভাবে বর্ষা প্রকৃতি মানুষের মনে এক নবীন সজীবতা ও অফুরন্ত আনন্দানুভূতির সঞ্চার করে।আর সেখানেই ঘটে-

     প্রকৃতির রূপান্তর ও শুষ্কতা মুক্তি। গ্রীষ্মের দাবদাহে জরাজীর্ণ প্রকৃতি যখন প্রখর তাপে দগ্ধ হতে থাকে, তখন বর্ষার আগমন ঘটে জীবনদায়ী বার্তা নিয়ে। কড়া রোদ, ধুলাবালি ও ধূসরতার অবসান ঘটিয়ে মেঘের ঘনঘটা প্রকৃতিকে নতুন রূপ দান করে। সজল বাতাসের ছোঁয়ায় নদী-নালা ভরা যৌবন পায়, গাছপালা নতুন সবুজ পাতায় সেজে ওঠে। প্রকৃতির এই বাহ্যিক সজীবতা ও পুনর্জন্ম মানুষের মন থেকেও ক্লান্তিকর একঘেয়েমি ধুয়ে-মুছে দেয় এবং এক নতুন প্রাণস্পন্দনের সঞ্চার করে।

      হৃদয়ে অনাবিল আনন্দ ও রোমান্টিক আবেশ।প্রমথ চৌধুরী দেখিয়েছেন, বর্ষা কেবল বহির্বিশ্বকেই বদলায় না, মানুষের অন্তর্জগতকেও গভীরভাবে আলোড়িত করে। আকাশে মেঘের সমারোহ এবং অঝোর ধারায় বৃষ্টিপাতের সুর মানুষের মনে এক অহেতুক আনন্দ ও রোমান্টিক আবেশের জন্ম দেয়। প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা ও যান্ত্রিকতা ভুলে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রকৃতির এই বিশালতার সামনে থমকে দাঁড়ায় এবং এক নির্মল মানসিক পরিতৃপ্তি লাভ করে।

     কাব্যময়তা ও প্রাচীন সাহিত্যের স্মৃতি।বর্ষা ও কাব্যের সম্পর্ক চিরন্তন। প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যের, বিশেষ করে মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূত’-এর কথা স্মরণ করেছেন। বর্ষার মেঘ ও সজল হাওয়া মানুষের কল্পনাশক্তিকে জাগ্রত করে, মনকে কবি বানিয়ে তোলে। যুগ যুগ ধরে বর্ষা যেভাবে মানুষের মনে বিরহ, মিলন আকাঙ্ক্ষা ও কাব্যিক আবেশ জাগিয়ে তুলেছে, আধুনিক মানুষের হৃদয়েও তা একই রূপ রস সঞ্চার করে। এই নান্দনিক ভাবালুতা মানসিকভাবে মানুষকে সতেজ ও সংবেদনশীল রাখে।

     যান্ত্রিক জীবনে বিরতি ও গৃহকোণের নিবিড় প্রশান্তি।বর্ষার বৃষ্টিধারা মানুষের স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে এক ধরণের সাময়িক স্থবিরতা বা বাধ্যবাধকতামূলক অবসর নিয়ে আসে। এই বিরতি প্রাত্যহিক খাটাখাটনির পর মানুষকে নিজের ভেতরে ফিরে তাকাতে সাহায্য করে। ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বাইরের রিমঝিম বৃষ্টির দৃশ্য উপভোগ করা এবং প্রিয়জনের সাহচর্য লাভ করার মধ্যে যে নিবিড় প্রশান্তি রয়েছে, তা মানবমনে গভীর আনন্দের সঞ্চার করে।

       প্রমথ চৌধুরীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মননশীলতা।অন্যান্য রোমান্টিক লেখকদের মতো প্রমথ চৌধুরী বর্ষাকে শুধু আতিশয্যপূর্ণ আবেগ দিয়ে দেখেননি; বরং তাঁর বিখ্যাত ‘বীরবলী’ গদ্যরীতিতে বুদ্ধি ও মননের আলোকেও এর নান্দনিক দিকটি বিশ্লেষণ করেছেন। বর্ষার সৌন্দর্য মানুষকে বস্তুগত হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে তুলে এক ধরণের আত্মিক আনন্দ দেয়, যা মনের জীর্ণতা দূর করে চেতনাকে সঞ্জীবিত করে তোলে।

        পরিশেষে বলা যায় যে, প্রমথ চৌধুরীর ‘বর্ষা’ প্রবন্ধে বর্ষা কোনো সাধারণ ঋতু পরিবর্তন মাত্র নয়—তা হলো জীবনের জয়গান। বর্ষা প্রকৃতির অকৃপণ জলধারায় মাটি যেমন উর্বর ও শ্যামল হয়, তেমনি মানুষের মনও অনুভূতির স্পর্শে হয়ে ওঠে রসসিক, আনন্দিত ও সজীব। প্রকৃতি ও মানবহৃদয়ের এই গভীর নিবিড় সম্পর্কের চমৎকার মননশীল প্রকাশই হলো প্রবন্ধটির মূল উপাধ্য।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...