Skip to main content

ফলিত বা ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্র।। ফলিত বা ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্র কী? সমাজ জীবনে এর গুরুত্ব আলোচনা করো।

ফলিত বা ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্র।। ফলিত বা ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্র কী? সমাজ জীবনে এর গুরুত্ব আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় — স্নাতক দর্শন মাইনর / সপ্তম সেমিস্টার।

      ফলিত নীতিশাস্ত্রঃ নীতিশাস্ত্রের যে শাখায় পরম তাত্ত্বিক নীতির (যেমন: কান্তের কর্তব্যবাদ বা মিল-বেন্থামের উপযোগবাদ) বিচার-বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনের জটিল, আধুনিক ও বিতর্কিত নৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজা হয়, তাকে ফলিত বা ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্র (Applied Ethics) বলা হয়।আসলে

        পারম্পরিক নীতিশাস্ত্র যেখানে কেবল 'কোন আচরণ ভালো বা মন্দ' তার তাত্ত্বিক নিয়ম তৈরি করে, ফলিত নীতিশাস্ত্র সেখানে চিকিৎসা, পরিবেশ, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া বাস্তবিক নৈতিক সংকট সমাধানে কাজ করে।

          •সমাজ জীবনে ফলিত নীতিশাস্ত্রের গুরুত্ব•

       আমাদের আধুনিক জটিল সমাজব্যবস্থায় ফলিত নীতিশাস্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। সমাজ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফলিত নীতিশাস্ত্রের গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো-

    ১)আধুনিক নৈতিক সংকট ও দ্বন্দ্ব নিরসনঃবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে সমাজে এমন কিছু নৈতিক প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে যা অতীতে ছিল না।উদাহরণ এসবই আমরা বলতে পারি-

      চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে ইচ্ছামৃত্যু, গর্ভপাত, ক্লোনিং বা সেরোগেসি-র মতো সংবেদনশীল বিষয় সমাজে বিতর্ক তৈরি করেছে।আর সেকারণে-

        ফলিত নীতিশাস্ত্র এই সংকটগুলোতে আবেগ বা অন্ধ বিশ্বাস সরিয়ে যুক্তিনিষ্ঠ নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

    ২)পরিবেশ সুরক্ষা ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষাঃ বর্তমান সময়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ ধ্বংসের ফলে মানুষের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। আর এই সংকটময় প্রকৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে-

       ফলিত নীতিশাস্ত্র আমাদের শেখায় যে পরিবেশ ও অ-মানুষ প্রাণীদেরও স্বকীয় মূল্য রয়েছে। এটি মানুষকে পরিবেশকেন্দ্রিক হতে এবং ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ বা টেকসই উন্নয়ন  নিশ্চিত করতে অনুপ্রাণিত করে।

      ৩)পেশাগত ও সামাজিক দায়িত্ববোধ বৃদ্ধিঃ সমাজ জীবনের বিভিন্ন পেশার ক্ষেত্রে নিজস্ব নৈতিক মানদণ্ড রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।যেখানে-

   • চিকিৎসা নীতিশাস্ত্রঃ রোগীর অধিকার রক্ষা, গোপনীয়তা বজায় রাখা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।             •ব্যবসায়িক নীতিশাস্ত্রঃ কর্পোরেট জগতে দুর্নীতি বন্ধ, ক্রেতা সুরক্ষা এবং কর্মীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতে পথ দেখায়।                                                                                   •সংবাদ ও তথ্যপ্রযুক্তি নীতিশাস্ত্রঃ ভুয়ো খবর প্রতিরোধ, সাইবার অপরাধ হ্রাস এবং মানুষের ব্যক্তি-গোপনীয়তা রক্ষায় নীতিগত নির্দেশনা দেয়।

     ৪) সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাঃ   একটি সুস্থ সমাজ গঠনে সমতা ও ন্যায়বিচার অপরিহার্য। ফলিত নীতিশাস্ত্র সমাজে লিঙ্গবৈষম্য, বর্ণবাদ, শ্রেণিভেদ ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সমাজে সকলের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার নৈতিক যুক্তি যোগায় এই শাখা।

      ৫)আইন ও সরকারি নীতি প্রণয়নে নির্দেশনাঃরাষ্ট্র যখন নতুন কোনো আইন বা নীতি রচনা করে, তখন নীতিশাস্ত্র নৈতিক মানদণ্ড হিসেবে ভূমিকা পালন করে। যেমন—মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত কি না, বা তথ্যপ্রযুক্তিতে মানুষের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা  ব্যবহারের সীমা কতটুকু হওয়া উচিত, তা নির্ধারণে নীতিবিদদের মতামত অপরিহার্য।

       পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, ফলিত বা ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্র কেবল পাঠ্যবইয়ের তাত্ত্বিক আলোচনায় আবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; এটি মানব সমাজের একটি জীবন্ত দিকদর্শন। মানবকল্যাণ সাধন, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং একটি বাসযোগ্য ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে ফলিত নীতিশাস্ত্রের গুরুত্ব অপরিসীম।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...