প্রাক ঔপনিবেশিক।।প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতে লিখিত নথিপত্রের ইতিহাস ও নানা মাধ্যম (Modalities) সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করো।
প্রাক ঔপনিবেশিক।।প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতে লিখিত নথিপত্রের ইতিহাস ও নানা মাধ্যম (Modalities) সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় — সপ্তম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,ভারতের ইতিহাস চর্চায় প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের (Precolonial Era) লিখিত উপাদানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগ বলতে মূলত প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে ১৮ শতকে ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে মুঘল আমল পর্যন্ত সময়কালকে বোঝায়। এই দীর্ঘ সময়কালে ঐতিহাসিক ঘটনা, প্রশাসনিক নির্দেশ, ভূমি অনুদান ও সাহিত্যিক উপাদান লিপিবদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের মাধ্যম ও লিপির ব্যবহার দেখা যায়। আর সেখানে দেখি-
১)লিখিত নথিপত্রের বিবর্তন ও ইতিহাসঃ প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতের লিখিত উপাদানের ইতিহাসকে তিনটি প্রধান পর্যায়ে ভাগ করা যায়। সেই ভাগগুলি হলো-
•প্রাচীন পর্বঃহরপ্পা সভ্যতার সীলমোহরে ভারতের প্রাচীনতম লিপির নিদর্শন পাওয়া গেলেও তা আজও অপঠিত। এরপর খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-চতুর্থ শতক থেকে ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপির মাধ্যমে লিখিত নথির নিয়মিত ব্যবহার শুরু হয়। মৌর্য সম্রাট অশোকের শিলালিপি হলো ভারতের লিখিত ইতিহাসের প্রথম সুস্পষ্ট প্রমাণ।
• গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্বঃ এই সময়ে সংস্কৃত ভাষার প্রাধান্য বাড়ে এবং প্রশাসনিক কাজে রাজকীয় তাম্রশাসনের (Copper-plate Grants) ব্যাপক প্রচলন ঘটে।
•মধ্যযুগ (সুলতানি ও মুঘল আমল): ১২ শতক থেকে ফারসি ভাষার আগমন ঘটে এবং নথিপত্র সংরক্ষণের প্রশাসনিক রূপ প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়। মুঘল আমলে কাগজের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় নথি তৈরির প্রক্রিয়া বহুগুণ সমৃদ্ধ হয়।
২)লিখিত নথিপত্রের (Modalities)নানা মাধ্যমঃ প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতে নথি লিপিবদ্ধ করার মাধ্যম বা উপাদানগুলোকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। সেই ভাগ গুলি হলো-
ক) পাথর ও শিলালিপিঃ স্থায়িত্বের দিক থেকে পাথর ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। আর সে কারণে রাজা বা সম্রাটের আদেশ, বিজয়গাথা ও ধর্মীয় নির্দেশ সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে শিলালিপি, গুহাচিত্র ও স্তম্ভলিপিতে (যেমন: অশোকের স্তম্ভলিপি, সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি) খোদাই করা হতো।
খ) ধাতু ও তাম্রশাসনঃ প্রাক-ঔপনিবেশিক ভূমিদান সংক্রান্ত নথির প্রধান মাধ্যম ছিল তাম্রশাসন। যেখানে ব্রাহ্মণ, মঠ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে জমি দান করার পর রাজকীয় সিলমোহরসহ তামা বা অন্যান্য ধাতুর পাতে অনুদানের শর্ত খোদাই করে দেওয়া হতো, যা আইনি দলিল হিসেবে কাজ করত।
গ) প্রাকৃতিক উপাদানে পান্ডুলিপি হিসেবে তালপাতাঃ বিশেষত দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে (বাংলা ও ওড়িশায়) গ্রন্থ এবং দলিল লেখার জন্য তালপাতা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। লোহার লেখনী দিয়ে তালপাতায় খোদাই করে পরে ভেষজ কালি মাখানো হতো।এরই পাশাপাশি-
ভোজপত্র (Birch Bark): উত্তর ভারত ও কাশ্মীর অঞ্চলে ভোজগাছের ছাল শুকিয়ে পান্ডুলিপি তৈরির কাজে ব্যবহার করা হতো।
ঘ) কাগজঃ ১৩ শতকের দিকে ভারতে কাগজের ব্যবহার শুরু হয় এবং মুঘল আমলে কাগজই হয়ে ওঠে রাজকীয় নথিপত্র তৈরির মূল উপাদান।সরকারি আদেশনামা, চুক্তিপত্র এবং ঐতিহাসিক বিত্তান্ত কাগজে লেখা হতে থাকে।
৩) প্রাক-ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক নথির নানা রূপঃ মুঘল ও আঞ্চলিক রাজ্যগুলোতে প্রশাসনিক কাজের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত নথি (Modalities) ব্যবহার করা হতো।আর সেখানে ছিল-
•ফারমানঃ বাদশাহ বা প্রধান শাসকের জারি করা সার্বভৌম রাজকীয় আদেশ।
•সনদঃ কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তিবর্গকে পদ, জমি বা অধিকার প্রদানের রাজকীয় সনদ বা অনুমতিপত্র।
•দস্তুর-উল-আমলঃ রাজস্ব ও প্রশাসনিক নিয়মকানুনের নির্দেশিকা সংবলিত সরকারি ম্যানুয়াল।
•সিয়াহা ও ওয়াকিয়াঃ দরবারের প্রতিদিনের ঘটনাবলী ও খবর লিপিবদ্ধ করার সরকারি খাতা।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতের লিখিত নথিপত্রের মাধ্যমগুলো কেবল ঐতিহাসিক তথ্য সরবরাহের উৎস নয়, বরং সেগুলো তৎকালীন প্রযুক্তি, শিল্পকলা ও প্রশাসনিক কাঠামোর পরিচয় বহন করে। পাথর থেকে তামার পাত, এবং পরবর্তীতে তালপাতা থেকে কাগজের এই মাধ্যমগত রূপান্তর ভারতের ইতিহাসের ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।
ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.
Comments
Post a Comment