Skip to main content

লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদ।। জন লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদ আলোচনা করো। তিনি কীভাবে প্রাকৃতিক অধিকারের (Natural Rights) ধারণা দিয়েছেন?

লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদ।। জন লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদ আলোচনা করো। তিনি কীভাবে প্রাকৃতিক অধিকারের (Natural Rights) ধারণা দিয়েছেন? পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর। 

       জন লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদ (Social Contract Theory) এবং তাঁর প্রাকৃতিক অধিকারের (Natural Rights) ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে। 


১. জন লকের সামাজিক চুক্তি মতবাদ (Social Contract Theory)

জন লক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Two Treatises of Government' (১৬৮৯)-এ সামাজিক চুক্তি মতবাদ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। লক তাঁর যুক্তিগুলোকে কয়েকটি ধাপে বিভক্ত করেছেন:

 * প্রাকৃতিক রাজ্য (State of Nature):

   থমাস হবসের মতো লক প্রাকৃতিক রাজ্যকে হিংসাত্মক বা সংঘাতময় মনে করেননি। লকের মতে, প্রাকৃতিক রাজ্য ছিল শান্তি, সদ্বিচ্ছা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার স্থান। এখানে মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সমান ছিল। এই রাজ্য পরিচালিত হতো প্রাকৃতিক আইন (Natural Law) এবং যুক্তিবোধ দ্বারা।

 * প্রাকৃতিক রাজ্যের অসুবিধা:

   শান্তিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও প্রাকৃতিক রাজ্যে তিনটি মূল সমস্যা ছিল:

   ১. লিখিত ও স্পষ্ট কোনো আইন ছিল না।

   ২. আইন প্রয়োগ বা ব্যাখ্যা করার জন্য কোনো নিরপেক্ষ বিচারক ছিল না।

   ৩. বিচারকের রায় কার্যকর করার মতো শক্তিশালী কোনো সর্বজনীন কর্তৃপক্ষ ছিল না।

 * সামাজিক চুক্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি:

   প্রাকৃতিক রাজ্যের এই অনিশ্চয়তা দূর করতে এবং নিজেদের অধিকারগুলো সুরক্ষিত রাখতে মানুষ চুক্তির মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করে। লকের মতে দুটি চুক্তি ঘটেছিল:

   * প্রথম চুক্তি: মানুষের নিজেদের মধ্যে চুক্তি, যার মাধ্যমে 'রাজনৈতিক সমাজ' বা সুশীল সমাজ (Civil Society) গঠিত হয়।

   * দ্বিতীয় চুক্তি: জনগণের সাথে শাসকের চুক্তি, যার মাধ্যমে 'সরকার' গঠন করা হয়।

 * সীমিত বা সাংবিধানিক সরকার (Limited Government):

   লকের রাষ্ট্রচিন্তায় শাসক পরম ক্ষমতার অধিকারী নন। সরকারের কাজ হলো জনগণের অধিকার ও সম্পত্তি রক্ষা করা। সরকার যদি চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বা জনগণের ট্রাস্ট (Trust) লঙ্ঘন করে, তবে জনগণের সেই সরকারকে পরিবর্তন বা উৎখাত করার অধিকার রয়েছে।

২. লকের প্রাকৃতিক অধিকারের (Natural Rights) ধারণা

জন লকের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা।

 * তিনটি মৌলিক অধিকার: লক মানুষকে জন্মগতভাবে তিনটি প্রধান প্রাকৃতিক অধিকারের অধিকারী বলেছেন—

   ১. জীবনের অধিকার (Right to Life): নিজের জীবন রক্ষা করার অধিকার।

   ২. স্বাধীনতার অধিকার (Right to Liberty): নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার স্বাধীনতা, যেখানে অপরের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে জীবন যাপন করা যায়।

   ৩. সম্পত্তির অধিকার (Right to Property): শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি ভোগ ও রক্ষা করার অধিকার।

 * শ্রমের তত্ত্ব (Labor Theory of Property): লকের মতে, ঈশ্বর এই পৃথিবী সমস্ত মানুষের ব্যবহারের জন্য দিয়েছেন। কিন্তু যখন একজন মানুষ প্রকৃতির দেওয়া সামগ্রীর সাথে নিজের 'শ্রম' যুক্ত করে, তখন তা তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে ওঠে।

 * অধিকারের অলঙ্ঘনীয়তা: লক স্পষ্ট করেছেন যে এই অধিকারগুলো রাষ্ট্র বা সরকারের দেওয়া কোনো দান নয়। এগুলো মানুষের জন্মগত ও প্রাক-রাষ্ট্রীয় অধিকার। তাই কোনো সরকার এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না; বরং রাষ্ট্র গঠনের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো এই তিন অধিকারকে রক্ষা করা।

মূল্যায়ন ও তাৎপর্য

জন লকের রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিশ্ব ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে:

 * উদারনীতিবাদের ভিত্তি: লককে আধুনিক উদারনীতিবাদের (Liberalism) জনক বলা হয়। তাঁর স্বৈরাচার-বিরোধী চিন্তা সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

 * আমেরিকান ও ফরাসি বিপ্লবে প্রভাব: লকের প্রাকৃতিক অধিকার ও সরকার পরিবর্তনের ধারণা ১৭৭৬ সালের আমেরিকান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (যেখানে Life, Liberty, and the pursuit of Happiness বলা হয়েছে) এবং ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

সংক্ষেপে: লকের মতে রাষ্ট্র একটি মানবসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান বা 'ট্রাস্ট', যার একমাত্র কাজ হলো মানুষের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট অধিকারগুলোকে সুরক্ষা প্রদান করা।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো।

অবক্ষয় যুগ। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে বাঙালির অবক্ষয় যুগের পরিচয় দাও। এই সময়ে টপ্পা ও আখড়াই গানের উদ্ভব ও জনপ্রিয়তার সামাজিক কারণগুলি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মাইনর।ইউনিট ৪।   অবক্ষয় যুগের পরিচয় এবং টপ্পা ও আখড়াই গানের সামাজিক কারণ ও অবক্ষয় যুগের পরিচয়          আমরা জানি যে,১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ (১৮৫০ খ্রি.) পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'অবক্ষয় যুগ' বা 'সন্ধিযুগ' বলা হয়।আর এটি ছিল মধ্যযুগের দেবনির্ভরতার অবসান এবং আধুনিক যুগের মানবতাবোধের সূচনার মধ্যবর্তী এক ক্রান্তিকাল।যেখানে এই সময়কালের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি  নিম্নরূপে আলোচনা করা যেতে পারে-        •রাজনৈতিক অস্থিরতাঃ নবাবী শাসনের পতন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলে বাংলার পুরনো শাসন ও অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।      •'বাবু' সংস্কৃতির উদয়ঃ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩ খ্রি.) ফলে গ্রামীণ বনেদি সমাজ ধ্...