সামাজিক নৃতত্ত্বের সঙ্গে সমাজতত্ত্ব কিভাবে সম্পর্কযুক্ত তা বিশ্লেষণ করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজবিদ্যা মাইনর, প্রথম সেমিস্টার।
আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,সামাজিক নৃতত্ত্ব (Social Anthropology) এবং সমাজতত্ত্ব (Sociology)-এই দুটি সামাজিক বিজ্ঞান একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে সম্পর্কিত। আর সেখানে আমরা দেখি-সামাজিক নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্ব উভয়ই মানুষের সমাজ, সামাজিক সম্পর্ক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করে। এই দুটি শাস্ত্রের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে নৃবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানীরা প্রায়শই বলে থাকেন যে, "সমাজতত্ত্ব এবং সামাজিক নৃতত্ত্ব হলো একই মুদ্রার দুটি পিঠ।"
১) আলোচনার বিষয়বস্তুর অভিন্নতাঃ উভয় শাস্ত্রেরই মূল লক্ষ্য হলো মানবসমাজকে বোঝা। সমাজতত্ত্ব সমাজে বসবাসকারী মানুষের আচার-ব্যবহার, সামাজিক প্রতিষ্ঠান (যেমন: পরিবার, ধর্ম, বিবাহ, রাজনীতি) এবং সামাজিক পরিবর্তন পর্যালোচনা করে।আসলে-
সামাজিক নৃতত্ত্বও ঠিক একইভাবে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সমাজের সামাজিক গঠন, সংস্কৃতি, বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করে। সুতরাং,উভয় শাস্ত্রেরই কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হলো মানব সমাজ ও তার সংস্কৃতি।
২)ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও উৎপত্তিঃ উনিশ শতকে যখন এই দুটি শাস্ত্র আলাদা শৃঙ্খলা হিসেবে গড়ে উঠছিল, তখন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন ছিল। আর সে কারণেই নৃতত্ত্ব প্রধানত আদিম বা প্রাক-শিল্পসমাজ নিয়ে গবেষণা শুরু করে। শুধু তাই নয়, সমাজতত্ত্ব আধুনিক ও শিল্পোন্নত সমাজ নিয়ে গবেষণা শুরু করে।তবে-
সময় অতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে এই কৃত্রিম পার্থক্য বিলুপ্ত হয়েছে। আধুনিক সমাজতত্ত্ববিদরা যেমন গ্রামীণ বা ক্ষুদ্র সমাজ নিয়ে কাজ করছেন, তেমনি সামাজিক নৃবিজ্ঞানীরাও আধুনিক শহর ও শিল্প এলাকার সমাজ নিয়ে ব্যাপকভাবে গবেষণা করছেন।
৩) গবেষণার পদ্ধতির আদান-প্রদানঃদুই শাস্ত্রই একে অপরের গবেষণা পদ্ধতি ব্যবহার করে সমৃদ্ধ হয়েছে। আর সেই পদ্ধতির দুটি হলো-
•অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণঃ সামাজিক নৃতত্ত্বের এই প্রধান পদ্ধতিটি বর্তমানে সমাজতত্ত্ববিদরা যেকোনো গভীর সামাজিক গবেষণায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেন।
•জরিপ ও পরিসংখ্যানঃ সমাজতত্ত্বের পরিমাপযোগ্য জরিপ পদ্ধতিটি আধুনিক নৃতাত্ত্বিকরা তাদের বৃহৎ সামাজিক গবেষণায় কাজে লাগাচ্ছেন।
৪) তাত্ত্বিক কাঠামোর পারস্পরিক অবদানঃ দুই শাস্ত্রের গবেষকরা একে অপরের তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন। আর সেখানে-
•নৃতত্ত্বের অবদানঃ সামাজিক নৃতাত্ত্বিক ব্রোনিসলো ম্যালিনোফস্কি এবং র্যাডক্লিফ-ব্রাউন-এর ক্রিয়াবাদ সমাজতত্ত্ববিদ তালকট পার্সন্স ও রবার্ট কে. মার্টন -কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
•সমাজতত্ত্বের অবদানঃ সমাজতত্ত্বের জনক অগাস্ট কোঁত, কার্ল মার্ক্স এবং এমিল দ্যুরখেইম -এর সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বসমূহ সামাজিক নৃতত্ত্বের কাঠামোগত বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫)ভারতীয় সমাজের বিশ্লেষণে সমন্বিত ভূমিকাঃ বিশেষ করে ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রে সামাজিক নৃতত্ত্ব এবং সমাজতত্ত্বের সীমান্ত প্রায় এক হয়ে যায়। এম. এন. শ্রীনিবাস-এর মতো বিখ্যাত গবেষকরা নৃতাত্ত্বিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারতীয় সমাজতত্ত্বের ক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর 'সংস্কৃতায়ন' এবং 'প্রভু জাতি' ধারণার মতো তত্ত্বগুলি সমাজতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বের যৌথ গবেষণার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তবে উভয়ের মধ্যে-গভীর সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দুটি শাস্ত্রের মধ্যে কিছু মৌলিক সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়ে গেছে।
পরিশেষে বলা যায় যে, বর্তমান বিশ্বায়ন ও আধুনিকায়নের যুগে সমাজতত্ত্ব ও সামাজিক নৃতত্ত্বের মধ্যবর্তী সীমানা প্রাচীর ভেঙে পড়েছে। নৃতত্ত্ববিদ ই. ই. ইভান্স-প্রিচার্ড -এর মতে- "সামাজিক নৃতত্ত্ব হলো সমাজতত্ত্বেরই একটি শাখা যা প্রধানত সরল সমাজগুলি নিয়ে আলোচনা করে।" আসলে আধুনিক জটিল মানবসমাজকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করতে হলে সমাজতত্ত্ব ও সামাজিক নৃতত্ত্ব—উভয় শাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গির মেলবন্ধন অত্যন্ত আবশ্যক।
Comments
Post a Comment