Skip to main content

চর্যাপদ।। চর্যাপদের ভাষা বা ‘সন্ধ্যা ভাষা’ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।

 চর্যাপদ।। চর্যাপদের ভাষা বা ‘সন্ধ্যা ভাষা’ সম্পর্কে সংক্ষেপে লেখো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর ও মাইনর।

      আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন চর্যাপদ। আর এই চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা বা বঙ্গ-কামরূপী রূপের প্রতিনিধিত্ব করে। এর ভাষার অন্তর্নিহিত রহস্যময়তা ও অস্পষ্টতার কারণে সাহিত্যবিশারদগণ একে  ‘সন্ধ্যাভাষা’ বা ‘সান্ধ্যভাষা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।তবে-

    • এই চর্যাপদের ‘সন্ধ্যা ভাষা’র নামকরণ ও তাৎপর্য বিশ্লেষণে বলা যেতে পারে যে,চর্যাপদের ভাষার প্রকৃতি আলোচনা করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ‘সন্ধ্যা ভাষা’ নামটির প্রসঙ্গ আসে। আর সেখানে পণ্ডিতগণের মতামতকে সামনে রেখে বলা যেতে পারে যে-

       মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদের পুথি আবিষ্কারের পর এর ভাষা সম্পর্কে বলেছিলেন-

    “আলো-আঁধারি ভাষা, কতকা আলো, কতকা অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিক বুঝা যায় না।”

      অর্থাৎ, দিনের শেষে এবং রাতের শুরুতে সন্ধ্যার সময় যেমন সব কিছু স্পষ্ট দেখা যায় না, ঠিক তেমনই চর্যাপদের ভাষার একটি অর্থ বাইরে থেকে স্পষ্ট মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে থাকে অন্য এক গূঢ় অর্থ। শুধু তাই নয়-

     চর্যাপদের শব্দগত ব্যাখ্যায় আমরা দেখতে পাই যে,পণ্ডিত বিদূশেখর ভট্টাচার্য ও পরবর্তীতে ড. সুকুমার সেন এবং ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচীর মতে, এটি আসলে ‘সন্ধ্যা’ (Evening) নয়, শব্দটি হলো ‘সন্ধা ভাষা’ (সম্ + ধা + অ)। ‘সন্ধা’ শব্দটির অর্থ ‘অভিপ্রায়’ বা ‘গূঢ় অর্থ’। অর্থাৎ, যে ভাষার অন্তরালে বিশেষ কোনো গোপন বা রূপক অর্থ লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তা-ই ‘সন্ধা ভাষা’।তবে-

    • চর্যাপদের দ্ব্যর্থকতা বা দুই ধরণের অর্থপ্রতীয়মান। আসলে চর্যাপদের পদগুলি সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা (যেমন—লুইপা, কাহ্নপা, ভূসুকুপা প্রমুখ) রচনা করেছিলেন। তাঁদের সাধনপ্রণালী সাধারণ মানুষের কাছে গোপন রাখার জন্য তাঁরা এমন ভাষার আশ্রয় নিয়েছিলেন। চর্যাপদের প্রতিটি পদের প্রধানত দুটি অর্থ পাওয়া যায়। আর সেই অর্থ গুলি হলো-

   ক) বাচ্যার্থ (লৌকিক অর্থ): সাধারণ মানুষ বাহ্যিক যে সাধারণ বা লৌকিক দৃশ্যটি দেখতে পায়।

  খ) মর্মার্থ বা সাধনার্থ (গূঢ় অর্থ): যা কেবল মাত্র তান্ত্রিক সিদ্ধাচার্য বা দীক্ষিত সাধকরাই বোঝেন।

      •উদাহরণসহ আলোচনায় আমরা বলতে পারি যে,চর্যাপদের দ্ব্যর্থক বা সান্ধ্য রূপটি ভালোভাবে বোঝার জন্য, জানার জন্য  কয়েকটি বিখ্যাত পদের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যেখানে আমরা প্রথমেই  দেহকেন্দ্রিক রূপক (লুইপার পদ) পদের কথা উল্লেখ করতে পারি-

    “কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।                                                      চঞ্চল চীএ পইঠো কাল।।”

      অর্থাৎ কায়া বা শরীর হলো একটি শ্রেষ্ঠ গাছের মতো, আর তার পাঁচটি ডাল রয়েছে। চঞ্চল চিত্তে বা মনে কাল বা মৃত্যু প্রবেশ করে।আসলে-

    এখানে 'তরু' বা গাছ হলো মানুষের মানবদেহ। পঞ্চ ডাল হলো মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক)। চঞ্চল মন যখন ইন্দ্রিয়ের মোহে চালিত হয়, তখন মানুষ সংসারে আবদ্ধ হয়ে ধ্বংসের দিকে (কাল) এগিয়ে যায়।

     অপরপক্ষে অন্য একটি পদে আমরা গৃহস্থালি জীবনের রূপক (টেন্টণপার পদ) ওদের কথাও উল্লেখ করতে পারি-

    “টালত ঘর মোর নাহি পরবেসী।                                            হাাঁড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।”

        অর্থাৎ টিলার ওপর আমার ঘর, আমার কোনো প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন প্রেমিক বা অতিথি আসে।আসলে-

          সাধকের শূন্যতা বা নির্বাণ লাভের সাধনার কুণ্ডলিনী জাগ্রত করার সংকেত রয়েছে এতে। সাধক যখন সংসারের সমস্ত বাসনা মুক্ত হন, তখন তিনি একাকী (প্রতিবেশীহীন)। চঞ্চল মন শান্ত হওয়ায় বাসনারূপ ভাত আর হাঁড়িতে অবশিষ্ট থাকে না, তবুও পরম আনন্দের অনুভূতির নিত্য আগমন ঘটে। ডোম্বী ও নৌরূপক (কাহ্নপার পদ) পদে দেখতে আমরা দেখতে পাই-

    “গঙ্গা জউনা মাঝেঁ রে বহই নাই।                                      তহিঁ বুড়িলী মাতঙ্গি ডোইঅ লীলে পার করেই।।”

      অর্থাৎ গঙ্গা ও যমুনার মাঝখান দিয়ে নৌকা চলেছে। সেখানে মাতঙ্গী বা ডোম্বী (নিম্নবর্ণের নারী) নিমজ্জিত হয়ে সুখে পারাপার করছে।আসলে-

     এখানে গঙ্গা ও যমুনা হলো মানুষের দেহের বাম ও ডান দিকের দুটি প্রধান নাড়ী-ইড়া ও পিঙ্গলা। আর নৌকা বা মাতঙ্গী হলো মধ্যবর্তী সুষুম্না নাড়ী ও সহজসুন্দরী বা বোধিচিত্ত। সাধক যখন ইড়া ও পিঙ্গলাকে অতিক্রম করে সুষুম্না নাড়ীতে মন স্থির করেন, তখনই তিনি ভবভাব বা সংসারের পার হয়ে মহাসুখ লাভ করেন।

    • ‘সন্ধ্যা ভাষা’ ব্যবহারের কারণ।

সিদ্ধাচার্যগণ কেন এই ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, তার মূল কারণ দুটি-

১)গোপনীয়তা রক্ষা: সিদ্ধাচার্যদের গুহ্য সাধনপদ্ধতি যাতে অদীক্ষিত ও সাধারণ মানুষের হাতে পড়ে অবমূল্যায়িত না হয়।

২) সামাজিক নিরাপত্তা: তৎকালীন সমাজে প্রচলিত হিন্দু বা বৈদিক ভাবধারার সঙ্গে বৌদ্ধ তান্ত্রিক ভাবধারার সংঘাত এড়ানো।

     •বাংলা ভাষার প্রাচীন রূপ হিসেবে সান্ধ্য ভাষা।চর্যাপদের ভাষা যে প্রাচীন বাংলা, তা ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'Origin and Development of the Bengali Language' (ODBL)-এ ব্যাকরণগত ও ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। চর্যাপদে ব্যবহৃত শব্দাবলী- 'হাত', 'কান', 'ভাত', 'হাঁড়ি', 'নদী', 'গাছ', 'মাছ' ইত্যাদি প্রাকৃত থেকে উদ্ভূত বাংলা শব্দ।

     কারক ও বিভক্তি: 'এ', 'ত', 'হিঁ' ইত্যাদি বাংলা বিভক্তির প্রয়োগ।

       সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া: 'করিআ', 'লইআ', 'বহই' ইত্যাদি আধুনিক বাংলা ক্রিয়াপদের আদি রূপ।

     পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, চর্যাপদের 'সন্ধ্যা ভাষা' কেবল একটি অস্পষ্ট ভাষা নয়, এটি হলো প্রচ্ছন্ন রূপক ও প্রতীকে মোড়া এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনার ভাষা। বাহ্যিক লৌকিক জীবনচিত্র (নৌকা বাওয়া, ব্যাধের শিকার, তুলো ধোণা, বিয়ে ইত্যাদি) ব্যবহার করে ভেতরের পরমার্থিক তত্ত্বকে প্রকাশ করাই এই ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য। এটি একদিকে যেমন আদি বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক দলিল, অন্যদিকে প্রাচীন সাহিত্যরসের এক অনন্য নিদর্শন।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট এবং SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir.




Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...