Skip to main content

ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের পতনের কারণ লেখো।

ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের পতনের কারণ লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাস প্রথম,সেমিস্টার মাইনর।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে থাকি যে,ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের উত্থান যতটা দ্রুত ও নাটকীয় ছিল, এর পতনও ছিল ততটাই আকস্মিক। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মহামতি অ্যালেকজান্ডারের মৃত্যুর পর শক্তিশালী এই বিশাল সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে। আর এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করতে পারি। যেখানে -

     ১. অ্যালেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যু ও উত্তরাধিকারীর অভাব।। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ অব্দে মাত্র ৩২ বছর বয়সে অ্যালেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যু সাম্রাজ্যের মূল স্তম্ভ ধসিয়ে দেয়। মৃত্যুর পূর্বে তিনি কোনো যোগ্য উত্তরাধিকারী মনোনীত করে যাননি। ফলে তাঁর মৃত্যুর পরপরই সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতা দখলের জন্য সেনাপতিদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

      ২. সেনাপতিদের গৃহযুদ্ধ।। অ্যালেকজান্ডারের যোগ্য সেনাপতিরা (যাঁদের 'দিয়াদোচি' বলা হতো)-যেমন সেলিউকাস, টলেমি, অ্যান্টিগোনাস এবং লি সিমাকাস—সাম্রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হন। এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ফলে অবিভক্ত সাম্রাজ্যটি কয়েকটি পৃথক রাজ্যে (যেমন- সেলিউসিড, টলেমীয় ও অ্যান্টিগোনিড রাজ্য) বিভক্ত হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে।

     ৩. ভৌগোলিক বিস্তার ও দুর্বল কেন্দ্রীয় শাসন।। গ্রিস ও মিসর থেকে শুরু করে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল সাম্রাজ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো উন্নত ছিল না। একক কেন্দ্রীয় কেন্দ্র থেকে এত বড় ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চলের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

      ৪. বিজিত অঞ্চলের প্রজাদের অসন্তোষ।। ম্যাসিডনীয়রা বিভিন্ন বিজিত অঞ্চলে গ্রিক সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভূক্ত না করায় এবং গ্রিক-ম্যাসিডনীয় আধিপত্যের ফলে পারস্য ও অন্যান্য বিজিত এলাকার মানুষের মনে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়, যা প্রায়শই বিদ্রোহের রূপ নিত।

      ৫. রোমের উত্থান।। ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্য যখন গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত, ঠিক সেই সময় পশ্চিমে নতুন শক্তি হিসেবে সাম্রাজ্যবাদী রোমের উত্থান ঘটে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় ও প্রথম শতকের মধ্যে রোমানরা 'ম্যাসিডনীয় যুদ্ধ'  এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে খণ্ড-বিখণ্ড গ্রিক ও হেলেশীয় রাজ্যগুলিকে একে একে দখল করে নেয়। অবশেষে ৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিসরের টলেমীয় রাজবংশের পতনের মাধ্যমে ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট অস্তিত্বও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়।

    পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, কোনো শক্তপোক্ত শাসনতান্ত্রিক ভিত্তি গড়ে ওঠার আগেই অ্যালেকজান্ডারের মৃত্যু, সেনাপতিদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী ক্ষমতা দখলের লড়াই এবং সর্বশেষে উদীয়মান রোমান সাম্রাজ্যের আগ্রাসী নীতির ফলেই ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটেছিল।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...