Skip to main content

মৌর্য ও ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের তুলনামূলক আলোচনা করো(সাদৃশ্য সহ)।

মৌর্য ও ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্যের তুলনামূলক আলোচনা করো(সাদৃশ্য সহ)। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনার।

         আলোচনার শুরুতেই আমরা বলতে পারি যে,প্রাচীন বিশ্বের ইতিহাসে রাজনৈতিক বিস্তার, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সংস্কৃতি বিনিময়-এই তিন দিক থেকেই মৌর্য সাম্রাজ্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ – ১৮৫) এবং ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্য (বিশেষত দ্বিতীয় ফিলিপ ও আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সময়কাল, খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতক) বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। দুটি সাম্রাজ্যই বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে এক একচ্ছত্র ক্ষমতার সূচনা করেছিল। আর সেখানে তাদের মধ্যে যে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় সেগুলি হলো-

 প্রধান সাদৃশ্যসমূহ 

   ১) ম্যাসিডন সাম্রাজ্য দ্বিতীয় ফিলিপ ও তাঁর পুত্র বীর আলেকজান্ডারের সামরিক বুদ্ধিমত্তার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। আর সেই সাথে সাথেই

   • মৌর্য সাম্রাজ্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এবং কৌটিল্যের যৌথ দূরদর্শিতার ফলে নন্দ সাম্রাজ্য ধ্বংস করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

 • কেন্দ্রীয়ভূত শাসন ও বিশাল সেনাবাহিনীগত ভাবে উভয় সাম্রাজ্যেই শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন পরম ক্ষমতাশালী সম্রাট বা রাজা।

   • বিশালাকার সামরিক শক্তির প্রভাবে দুটি সাম্রাজ্যই বিশাল এলাকা জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। ম্যাসিডনীয় বাহিনীর ‘ফাল্যাঙ্কস’কৌশল এবং মৌর্যদের বিশাল পদাতিক, হস্তী ও রথ বাহিনী তাঁদের অপরাজেয় করে তুলেছিল।

    •সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মিশ্রণে দেখা যায়- আলেকজান্ডারের বিজয়ের ফলে গ্রিক ও প্রাচ্যের সংস্কৃতির মিলনে ‘হেলেনীয় সংস্কৃতি’র বিকাশ ঘটে।অপরদিকে-

    ‌‌ মৌর্য যুগে (বিশেষত অশোকের সময়) ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে গ্রিক ও মধ্য এশীয় প্রভাবের আদান-প্রদান ঘটে, যা স্থাপত্য ও শিল্পকলায় লক্ষ্য করা যায়।

    • আমলাতন্ত্র ও দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোতে দুই সাম্রাজ্যেই দূরবর্তী অঞ্চলসমূহ শাসনের জন্য আমলা, গুপ্তচর ও প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের উপর নির্ভর করা হতো।

••মূল বৈসাদৃশ্যসমূহ

    ১ সাম্রাজ্যের স্থায়িত্বগত ভাবে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রায় ১৪০ বছরেরও বেশি সময় টিকে ছিল এবং একটি স্থায়ী প্রশাসনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। কিন্তু -

       •আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যুর (খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩) সাথে সাথেই সাম্রাজ্যটি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে। 

     ২) প্রশাসনিক স্থায়িত্ব দিক থেকে সাম্রাজ্যটি প্রদেশ, জেলা ও গ্রামে বিভক্ত একটি সুনির্দিষ্ট ও সংগঠিত প্রশাসনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু -

      ম্যাসিডনীয় মূলত একটি সামরিক অভিযানভিত্তিক সাম্রাজ্য ছিল, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার সময় পাওয়া যায়নি। |

    ৩) সাম্রাজ্যের ধর্মীয় নীতিগত ভাবে,সম্রাট অশোক 'ধম্ম' প্রচার করেন এবং যুদ্ধের পরিবর্তে অহিংসা ও বৌদ্ধধর্মের বাণী ছড়িয়ে দেন। কিন্তু-

       ম্যাসিডনীয় শাসকেরা মূলত সামরিক বিজয় ও বিজিত অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের ওপর আলোকপাত করেছিলেন; ধর্মীয় আদর্শ প্রচারে মনোযোগী ছিলেন না। |

     ৪) উক্ত দুই সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হিসাবে দেখা যায়, মৌর্য সাম্রাজ্য দূরবর্তী প্রদেশের বিদ্রোহ, দুর্বল পরবর্তী শাসক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ধীর গতিতে পতন ঘটে। কিন্তু-

     যোগ্য উত্তরাধিকারীর অভাব এবং সেনাপতিদের গৃহযুদ্ধের কারণে দ্রুত পতন ঘটে। |

     •ঐতিহাসিক তাৎপর্যঃ মৌর্য সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব ও কল্যাণকামী রূপ: মৌর্য শাসন কেবল সামরিক বিজয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র এবং অশোকের শিলালেখ থেকে প্রমাণিত হয় যে এটি একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রয়াস ছিল।

      ম্যাসিডনের বৈশ্বিক সংযোগঃ ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্য স্থায়ী না হলেও তা প্রাচ্য ও প্রাতিচ্যের প্রাচীর ভেঙে দিয়েছিল এবং সিল্ক রুটসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের উন্মোচনে সহায়তা করেছিল।

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, মৌর্য ও ম্যাসিডনীয়-উভয় সাম্রাজ্যই তাদের সমকালীন ইতিহাসে অভূতপূর্ব ক্ষমতার প্রদর্শন করেছিল। ম্যাসিডনীয় সাম্রাজ্য যেখানে বিশাল ভূগোল জুড়ে দ্রুত বিস্তৃত হয়ে ক্ষণস্থায়ী কিন্তু গভীর সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলেছিল, সেখানে মৌর্য সাম্রাজ্য একটি সুগঠিত, দীর্ঘস্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে এক ঐক্যবদ্ধ রাজনীতির রূপরেখা তৈরি করেছিল।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...