মনসামঙ্গল।।‘মনসামঙ্গল কাব্যের কবি হিসেবে বা শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে বিজয় গুপ্তের কবি প্রতিভা’র পরিচয় দাও। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর ও মাইনর।
আমরা জানি যে,মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের লৌকিক মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম আদি এবং শ্রেষ্ঠ কবি হলেন বিজয় গুপ্ত। বর্তমান বাংলাদেশের বরিশাল জেলার গোয়েলা (বা গৈলা) গ্রামে তাঁর জন্ম। ১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে (শকাব্দ ১৪১৫) তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘পদ্মপুরাণ’, যা সাধারণকভাবে মনসামঙ্গল কাব্য নামেই পরিচিত। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী বা শাক্ত পদাবলীর পাশাপাশি মঙ্গলকাব্য ধারায় যে লৌকিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে, তার প্রথম সফল রূপকার ছিলেন বিজয় গুপ্ত। একজন কবি হিসেবে তাঁর প্রতিভার মূল্যায়নে সমসাময়িক সমাজচিত্র, বাস্তবতাবোধ, চরিত্র সৃষ্টি এবং লোকায়ত ভাষার ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।আর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে রেখে বলা যায় যে -
১. সমাজসচেতনতা ও বাস্তবতাবোধ:বিজয় গুপ্তের কাব্য প্রতিভার অন্যতম প্রধান দিক হলো তাঁর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং বাস্তবসম্মত সমাজচেতনা। পৌরাণিক দেবদেবীর আখ্যানের অন্তরালে তিনি তাঁর সমকালের পঞ্চদশ শতকের বাংলার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে তুলে ধরেছেন।আর সেখানে আমারা দেখতে পাই-
- সেকালের নদীমাতৃক বাংলার জনজীবন, চাষবাস, হাটবাজার, এবং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সুখ-দুঃখ তাঁর কাব্যে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
- তৎকালীন সমাজে ব্রাহ্মণ সমাজ ও লৌকিক দেবী মনসার উপাসকদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব এবং নতুন ধর্মমতের প্রতিষ্ঠা কীভাবে ঘটেছিল, তার এক ঐতিহাসিক দলিল হলো বিজয় গুপ্তের ‘পদ্মপুরাণ’।
২. মানবীয় আবেগ ও চরিত্র চিত্রণ:
বিজয় গুপ্তের কাব্যে দেব-দেবী অপেক্ষা রক্তমাংসের মানুষই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। স্বর্গীয় কুশীলবদের চেয়ে মর্ত্যের মানব চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে কবি অসাধারণ মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন:
- চাঁদ সওদাগর: চাঁদ সওদাগর হলেন পুরুষ অহংকার, পৌরুষ এবং শিবভক্তিসর্বস্ব এক অনমনীয় চরিত্র। মনসার ভয়ে নত না হয়ে আজীবন লড়াই করে যাওয়া চাঁদ সওদাগরের জেদ ও অভিমানকে কবি এক মহিমায় ভূষিত করেছেন।
- সনকা ও বেহুলা: সনকার মাতৃস্নেহ এবং পতিব্রতা বেহুলার আত্মত্যাগ ও অদম্য সাহসিকতা বিজয় গুপ্তের তূণীরে সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্ন। স্বামীর প্রাণরক্ষার্থে সাপের বিষে মৃত স্বামীর সঙ্গে ভেলায় ভেসে যাওয়ার রোমাঞ্চকর ও বেদনাভরা চিত্রটিতে বেহুলা এক অনন্য মহিমায় উন্নীত হয়েছেন।
- দেবতাদের মানবীকরণ: মনসা বা শিবের মতো দেবতারাও বিজয় গুপ্তের হাতে সাধারণ মানুষের মতো রাগ, অভিমান, জেদ ও প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে পড়েছেন, যা তৎকালীন শ্রোতাদের কাছে কাব্যটিকে অত্যন্ত সুগম ও চিত্তাকর্ষক করে তুলেছিল।
৩. কাহিনীর গতিশীলতা ও নাট্যধর্মিতা:
কাব্য রচনায় বিজয় গুপ্ত শুধু তথ্য বা পৌরাণিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেননি, বরং তিনি এক সহজাত নাট্যবোধের পরিচয় দিয়েছেন। কাহিনীর বাঁকে বাঁকে রহস্য, দ্বন্দ্ব এবং ট্র্যাজেডির আবহ তৈরি করতে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা ডোবার দৃশ্য, লখিন্দরের বাসরঘরে সর্পদংশন এবং বেহুলার মৃতদেহ নিয়ে অন্তিম যাত্রার দৃশ্যগুলো পাঠক মনে গভীর শোক ও নাট্যরসের সৃষ্টি করে।
৪. ভাষা, শৈলী ও লোকায়ত অলংকার:
বিজয় গুপ্তের ভাষা ছিল অত্যন্ত সহজ, সরল ও প্রবহমান। পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক কথ্য ভাষার নানা উপাদান ও লৌকিক উপাদানকে তিনি অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে সাহিত্যের মার্জিত স্তরে উন্নীত করেছিলেন। তাঁর কাব্যের পয়ার ও ত্রপদী ছন্দ সাবলীল। তাছাড়া সেকালের সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত প্রবচন, লোককথা এবং উপমা তাঁর কাব্যকে এক আলাদা প্রাণরস জুগিয়েছিল।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যযুগের অন্ধকার ও আচ্ছন্নতার যুগে বিজয় গুপ্ত কেবল একজন ধর্মপ্রচারক কবি ছিলেন না, ছিলেন এক প্রকৃত শিল্পমনস্ক স্রষ্টা। সমসাময়িক সমাজের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তিনি দেব-দেবী ও মানুষের মেলবন্ধনে এক অবিনাশী কাব্য সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে লোকায়ত সংস্কৃতির সার্থক রূপকার এবং মনসামঙ্গল ধারার পথপ্রদর্শক হিসেবে বিজয় গুপ্তের কবি প্রতিভা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
Comments
Post a Comment