Skip to main content

শিক্ষার লক্ষ্য।।"শিক্ষার লক্ষ্য হলো মানুষের সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধন করা।"— বিশদভাবে আলোচনা করো। অথবা, "শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীর সুসংহত বিকাশ"— উক্তিটি আলোচনা করো।

শিক্ষার লক্ষ্য।।"শিক্ষার লক্ষ্য হলো মানুষের সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধন করা।"-বিশদভাবে আলোচনা করো। অথবা, "শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীর সুসংহত বিকাশ"— উক্তিটি আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।

    আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,শিক্ষা একটি জীবনব্যাপী, গতিশীল ও বহুমুখী প্রক্রিয়া। আর সে কারণে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত শিক্ষার সংজ্ঞায় নানা পরিবর্তন এসেছে। প্রাচীনকালে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিল জ্ঞান অর্জন বা আত্মোপলব্ধি, কিন্তু আধুনিক শিক্ষাবিজ্ঞান শিক্ষার ধারণাকে কেবল বইয়ের পাতায় বা ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। আধুনিক শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, প্রাক্ষোভিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক সহ সমস্ত সম্ভাবনার পূর্ণ ও সুসংহত বিকাশ ঘটানো। অর্থাৎ, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধন করা। যেখানে-

      সর্বাঙ্গীন বিকাশ বলতে আমরা জানি মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের একটি একক সত্তা নয়; মানুষের ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত।তাই সর্বাঙ্গীন বিকাশ বলতে বোঝায় ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের গঠনকারী সমস্ত দিকগুলির একটি সুষম ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশ। শিক্ষাবিদ স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন-

"Education is the manifestation of the perfection already in man." (অর্থাৎ, মানুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত পূর্ণতার আত্মপ্রকাশই হলো শিক্ষা।)

       তবে অন্যান্য আধুনিক শিক্ষাবিদ যেমন- রুশো, ফ্রয়েবেল, পেস্তালোৎসি শিক্ষাকে এমন একটি স্বাভাবিক বিকাশমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন, যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষেত্রগুলিকে পূর্ণতা দেয়। যার মাধ্যমে মানুষ শিক্ষার ক্ষেত্রে পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়।

      শিক্ষার সর্বাঙ্গীন বা সুসংহত বিকাশের মূল ক্ষেত্রসমূহে আমরা দেখি যে,শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সর্বাঙ্গীন বিকাশের জন্য নিম্নলিখিত প্রধান দিকগুলির বিকাশ সাধন করা হয়। আর সেই দিকগুলি আমরা নিম্ন সূত্রাকারে আলোচনা করলাম। আর সেখানে-

        ক) দৈহিক বিকাশঃ "সুস্থ দেহে সুস্থ মন"এই নীতি মেনে শিক্ষার্থীর শারীরিক শক্তি, সুস্থতা ও স্থূল/সূক্ষ্ম পেশির সঞ্চালন বৃদ্ধি করা শিক্ষার অন্যতম প্রাথমিক কাজ। আর সেই কাজ হিসেব  বিদ্যালয়ে খেলাধুলা, শরীরচর্চা, যোগব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যবিধির শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর শারীরিক বিকাশ সুনিশ্চিত করা হয়।
     খ) মানসিক বা বৌদ্ধিক বিকাশঃ মানুষের চিন্তা শক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, যুক্তি বিচার, কল্পনা শক্তি এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতার বিকাশই হলো মানসিক বিকাশ। শুধু তাই নয়,বিভিন্ন পাঠ্যবিষয় পড়ানো, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কুইজ এবং অনুসন্ধিৎসামূলক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করা হয়।
    গ) সামাজিক বিকাশঃ  মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে অন্যদের সাথে কীভাবে মিলেমিশে থাকতে হয়, সহযোগিতার মনোভাব গঠন এবং সমাজসম্মত আচরণ শেখাই হলো সামাজিক বিকাশ। যেখানে- বিদ্যালয় হলো সমাজের একটি ক্ষুদ্র রূপ (Microcosm of Society)। দলগত কাজ, সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিশু সামাজিকতা, সহমর্মিতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ শেখে।
     ঘ) প্রাক্ষোভিক বিকাশঃ আবেগ বা ক্ষোভ (যেমন-রাগ, ভয়, ভালোবাসা, আনন্দ, ঈর্ষা ইত্যাদি) নিয়ন্ত্রণ ও সঠিক প্রকাশ করার সক্ষমতাকে প্রাক্ষোভিক বিকাশ বা 'Emotion Balance' বলে। তবে- শিক্ষার লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীকে নিজ আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে শেখানো, যাতে সে কঠিন পরিস্থিতিতেও আত্মসংযম ও সহনশীলতা বজায় রাখতে পারে।
      ঙ) নৈতিক ও চারিত্রিক বিকাশঃ ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য বিচার করার ক্ষমতা এবং উন্নত চরিত্র গঠন করা শিক্ষার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। নীতিশিক্ষা, মহান মনীষীদের জীবনী পাঠ এবং মূল্যবোধ শিক্ষার (Value Education) মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও বিশ্বস্ততার উন্মেষ ঘটানো হয়।
     চ) সৌন্দর্যবোধ ও সাংস্কৃতিক বিকাশঃ শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা অর্জন করা।অঙ্কন, নাচ, গান ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর নান্দনিক বোধকে জাগ্রত করা হয়।
    ছ) বৃত্তিমূলক বা অর্থনৈতিক বিকাশঃ শিক্ষা মানুষকে কেবল আদর্শ নাগরিকই করে তোলে না, বরং ভবিষ্যতে আত্মনির্ভরশীল ও জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তোলে। আর সেখানে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদান করে শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনে স্বাবলম্বী করে তোলা হয়।

আধুনিক শিক্ষায় সর্বাঙ্গীন বিকাশের গুরুত্ব ও মহাত্মা গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গি।

      শিক্ষার সর্বাঙ্গীন বিকাশের লক্ষ্যটি মহাত্মা গান্ধীর 'Basic Education' (বুিয়াদী শিক্ষা) নীতিতে খুব সুন্দরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি "3R's" (Reading, Writing, Arithmetic)-এর পরিবর্তে "3H's"-এর ওপর জোর দিয়েছিলেন। যেখানে-Head (মস্তিষ্ক), যেটি মানসিক ও বৌদ্ধিক চিন্তার বিকাশ।Heart (হৃদয়), প্রাক্ষোভিক, নৈতিক ও অনুভূতির বিকাশ।Hand (হাত)যেটি দৈহিক কাজ ও বৃত্তিমূলক দক্ষতার বিকাশ।

        এছাড়াও, কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬) এবং ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020)-তেও শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক এবং ‘Holistic Education’ বা সমগ্রতাবাদী শিক্ষার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে।

      পরিশেষে আমরা উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলতে পারি যে, শিক্ষার কাজ কেবল তথ্য সরবরাহ করা বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করা নয়। যদি কোনো শিক্ষার্থী কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায় কিন্তু তার সামাজিকতা, নৈতিকতা বা দৈহিক বিকাশ না ঘটে, তবে সেই শিক্ষাকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না।সুতরাং,-

     একজন শিক্ষার্থীকে আদর্শ, সৎবিবেচক, কর্মক্ষম এবং সমাজের দরকারী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তার সুসংহত ও সর্বাঙ্গীন বিকাশ অত্যন্ত আবশ্যক। তাই এক কথায় বলা যায়- "শিক্ষার সর্ব প্রধান ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষের সর্বাঙ্গীন ও সুসংহত বিকাশ সাধন করা।"

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...