Skip to main content

আমার দুর্গোৎসব।।'আমার দুর্গোৎসব' প্রবন্ধটি বাঙালি জাতি এবং মাতৃভূমির প্রতি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গভীর ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী দলিল-কমলাকান্তের গ্ৰন্থ অবলম্বনে আলোচনা করো

আমার দুর্গোৎসব।।'আমার দুর্গোৎসব' প্রবন্ধটি বাঙালি জাতি এবং মাতৃভূমির প্রতি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গভীর ভালোবাসার এক মর্মস্পর্শী দলিল-কমলাকান্তের গ্ৰন্থ অবলম্বনে আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়/কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,পঞ্চম সেমিস্টার, বাংলা মেজর)DS9, Unit 1.

          আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,আমার দুর্গোৎসব' প্রবন্ধটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তর' (১৮৭৫) গ্রন্থের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন রচনা।আর এই প্রবন্ধটি আফিংখোর ব্রাহ্মণ কমলাকান্তের জবানিতে রচিত হলেও, এটি কেবলমাত্র রম্য-ব্যঙ্গ নয়, বরং গভীর দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ এবং দার্শনিক ভাবনার এক অপূর্ব মিশ্রণ। তাই আমরা বলতে পারি-এটি কেবল একটি প্রবন্ধ নয়, বরং একটি পরাধীন জাতির হৃদয়ের স্পন্দন।আর সেই স্পন্দনে স্পন্দিত হয়ে -

         আমরা বলতে পারি যে,'আমার দুর্গোৎসব' প্রবন্ধটি অবশ্যই বাঙালি জাতি ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার দলিল।আসলে 'আমার দুর্গোৎসব' প্রবন্ধটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'কমলাকান্তের দপ্তর' (১৮৭৫) গ্রন্থের অন্তর্গত।আর এই রচনায় আফিংখোর ব্রাহ্মণ কমলাকান্তের কল্পনাবিলাসের মাধ্যমে হাস্যরসের পরিবর্তে গভীর দেশপ্রেম ও আত্মিক যন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে, যা প্রবন্ধটিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিভূমি হিসেবে স্থাপন করেছে। সেই ভিত্তিভূমিতে আমরা দেখি-

১. মাতৃবন্দনার সার্থক রূপক দুর্গাপ্রতিমা।আর সেখানে এই প্রবন্ধের সবচেয়ে বড় দিক হলো, বঙ্কিমচন্দ্র প্রচলিত ধর্মীয় প্রতিমাকে মাতৃভূমির প্রতীকে রূপান্তরিত করেছেন।আর সেখানে-

    প্রতিমা বিসর্জন হলো পরাধীনতার গ্লানি। প্রবন্ধের শুরুতে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।কমলাকান্তের চোখে এই বিসর্জন কেবল মাটির মূর্তির বিদায় নয়, এটি হলো পরাধীন বঙ্গদেশ বা ভারতমাতার লাঞ্ছনা ও দুর্গতি। প্রতিমার বিসর্জনকালে কমলাকান্তের যে শোক ও করুণা, তা একজন দেশপ্রেমিকের হৃদয়ে বিরাজমান।আর সেখানে কমলাকান্তকে বলতে শুনি-

   "এ প্রতিমা তুমি কোথায় পাইলে? কে তোমাকে এই প্রতিমা গড়িয়া দিল?" 

      আসলে এই প্রশ্নটির মাধ্যমে লেখক যেন জানতে চেয়েছেন, জাতির এই দুর্দশার কারণ কী? আর বিসর্জনের পরপরই আসে-

    আহ্বান।যে আহ্বান আসলে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার নামান্তর।কমলাকান্ত এই মাতৃরূপকে আহ্বান করেন যেন তিনি আবার ফিরে আসেন। এটি দেবীর কাছে প্রার্থনা নয়, বরং বলা যেতে পারে-স্বাধীনতার জন্য একটি জাতির মর্মের আর্তি। আসলে তিনি চান-

      মা আবার শুভ্রবস্ত্র পরিধান করে, শস্য-শ্যামলা ও ঐশ্বর্যময় রূপে ফিরে আসুন।

       ২. অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের চিত্রণে কমলাকান্তের কল্পনায় মা দুর্গা যে তিনটি রূপে আবির্ভূত হন, তা বাঙালি জাতি ও মাতৃভূমির প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের ঐতিহাসিক ও আবেগময় ভালোবাসার প্রতিফলন।আর সেখানে মাতৃমূর্তি হলো প্রতীকী অর্থ,ভালোবাসা ও প্রত্যাশার স্বরূপ।

    আসলে দশমহাবিদ্যা রূপ হল অতীতের গৌরবময় ভারত, অতীত ভারতের শক্তি ও জ্ঞান-ঐশ্বর্যের প্রতি শ্রদ্ধা।আর অসুর দ্বারা আক্রান্ত বর্তমান রূপ হলো পরাধীন বঙ্গদেশ , যেটি বর্তমান দেশের দুর্দশায় গভীর বেদনা ও দুঃখ। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ (সম্পদ, জ্ঞান, শক্তি, সাফল্য) থাকা সত্ত্বেও অসুর (বিদেশী শাসন) দ্বারা আক্রান্ত। তবে-

      শুভ্রবস্ত্র পরিহিতা জননী রূপ হলো ভবিষ্যতের স্বাধীন ও সমৃদ্ধ ভারত।যা মাতৃভূমিকে পুনরায় কলঙ্কমুক্ত, স্বাধীন ও ঐশ্বর্যময় দেখার জন্য বঙ্কিমচন্দ্রের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন দেখায়।

     ৩. গদ্যে গীতিকাব্য ও হৃদয়াবেগের প্রকাশ আমার দুর্গোৎসব।'আমার দুর্গোৎসব' প্রবন্ধটিকে কেবল দেশপ্রেমের দলিল বলা হয় না, এটি বঙ্কিমচন্দ্রের কবিত্বশক্তিরও শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। আসলে কাব্যময় ভাষা এই প্রবন্ধের গদ্যশৈলী অত্যন্ত আবেগপূর্ণ, অলঙ্কারময় এবং ছন্দোময়। এতে ব্যবহৃত উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও গভীর অনুভূতি প্রকাশ করে যে এই লেখাটি কেবল মস্তিষ্ক থেকে নয়, হৃদয়ের গভীরতম স্তর থেকে এসেছে। আবার-

       প্রবন্ধটিতে আছে শোক ও আশা মিশ্রণ। লেখক তাঁর ব্যক্তিগত বিষাদকে জাতীয়তাবাদের মহৎ আদর্শে উন্নীত করেছেন। এই প্রবন্ধে হতাশা যেমন আছে, তেমনি আবার পুনর্জাগরণের আশাও প্রস্ফুটিত হয়েছে।

     পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, 'আমার দুর্গোৎসব' প্রবন্ধটি শুধুমাত্র বাঙালি জাতির দুর্গোৎসব পালনের বর্ণনা নয়, বরং পরাধীনতার গ্লানিতে ভোগা মাতৃভূমির প্রতি একজন সাহিত্যিকের আত্মিক প্রেম ও ভক্তির প্রকাশ। এই রচনা বাঙালি জাতির মনে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধের বীজ বপন করেছিল, যা এটিকে বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ করে তুলেছে।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...