Skip to main content

মনসামঙ্গল।। মনসামঙ্গলকাব্যের কাহিনি এবং আর্য-অনার্য সংঘাত ও সমন্বয় আলোচনা করো।

মনসামঙ্গল।। মনসামঙ্গলকাব্যের কাহিনি এবং আর্য-অনার্য সংঘাত ও সমন্বয় আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার বাংলা মেজর মাইনর এবং কোর।

     •মনসামঙ্গলকাব্যের সংক্ষেপিত কাহিনি মূলত দুটি খণ্ডে বিভক্ত-স্বর্গখণ্ড এবং মর্ত্যখণ্ড।

     •স্বর্গখণ্ডঃশিবের বীর্য থেকে পদ্মপত্রে মনসার জন্ম। স্বর্গ থেকে অভিশাপগ্রস্ত হয়ে মর্ত্যে আসেন অনিরুদ্ধ ও ঊষা, যারা মর্ত্যে লখিন্দর ও বেহুলা রূপে জন্মগ্রহণ করেন।

     •মর্ত্যখণ্ড ও মূল সংঘাতঃশিবভক্ত চম্পক নগরের ধনপতি ব্যবসায়ী চাঁদ সওদাগর কিছুতেই সর্পদেবী মনসাকে পূজা করতে রাজি নন। কারণ মনসা লৌকিক দেবী, আর চাঁদ পৌরাণিক দেব মহাদেবের ভক্ত।তবে-

        পূজা না পেয়ে ক্রুদ্ধ মনসা চাঁদের সপ্তডিঙা মধুকর সমুদ্রে ডুবিয়ে দেন এবং চাঁদের ছয় পুত্রকে বিষধর সর্প দ্বারা ধ্বংস করেন। তবুও চাঁদ অটল থাকেন।অতঃপর আমরা দেখি-বেহুলা-লখিন্দরের আখ্যান।চাঁদের সপ্তম পুত্র লখিন্দরের বিয়ের রাতে লৌহবাসর ঘরে মনসার পাঠানো কালনাগিনী তাকে দংশন করে। সতীতেন্তে বলীয়ান বেহুলা ভেলায় চড়ে ভেসে যান এবং দেবপুরে পৌঁছে নাচ-গানে তুষ্ট করে দেবগণের কাছ থেকে লখিন্দরসহ ছয় ভাইয়ের প্রাণ ফিরিয়ে আনেন।অবশেষে-

       • বেহুলার অনুরোধে এবং দেবগণের আদেশে চাঁদ সওদাগর অবশেষে বাঁ হাতে মনসাকে একটি পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করেন। এর মাধ্যমে মর্ত্যে দেবী মনসার পূজা প্রতিষ্ঠিত হয়।

      •আর্য-অনার্য সংঘাত ও সমন্বয়ের চিত্রঃ মনসামঙ্গল কাব্য কেবল একটি পৌরাণিক বা অলৌকিক দেবকাহিনি নয়; এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, ধর্মীয় এবং নৃতাত্ত্বিক রূপান্তরের এক মহান দলিল।আর সেই দলিলে দেখি-

   সামাজিক ও ধর্মীয় পটভূমি। যে পটভূমিতে আছে-আর্য সংস্কৃতি। আসলে শিব ছিলেন বৈদিক ও পৌরাণিক ধারার আর্য সংস্কৃতির প্রতীক। সমাজের উচ্চবর্ণ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং সমৃদ্ধ বণিকশ্রেণি শিবের পূজারি ছিল।এরই পাশাপাশি ওঠে আসে-

     অনার্য সংস্কৃতি। দেবী মনসা ছিলেন লৌকিক, দ্রাবিড়/অনার্য জনজাতির সর্পদেবী। নিম্নেবর্ণের বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী (যেমন হাড়ি, ডোম, জেলে) দ্বারা তিনি পূজিতা হতেন।যেখানে সংঘাতের স্বরূপ হলো-

        আভিজাত্য বনাম লৌকিকতা।চাঁদ সওদাগর আর্য পুরুষতন্ত্র ও আভিজাত্যের প্রতীক। তিনি লৌকিক দেবী মনসাকে "কানা চোখা পদ্মা" বলে অবজ্ঞা করেছেন।তবুও চলতে থাকে- শক্তির লড়াই।মনসা তাঁর অস্তিত্ব ও পূজা প্রতিষ্ঠার জন্য একের পর এক অত্যাচার চালান—চাঁদের সুন্দর কানন ধ্বংস, পুত্রদের হত্যা, ডিঙা নিমজ্জনের মতো নৃশংস পথ বেছে নেন। অন্যদিকে চাঁদ শত বিপদেও হেইটাল লাঠি হাতে মনসার বিরুদ্ধে নিজের পুরুষকার ও আত্মমর্যাদা টিকিয়ে রাখার লড়াই করেন।আসলে-

       এই কাব্যে কেবল আর্য বা অনার্য কোনো এক পক্ষের একক জয় হয়নি। মনসা বুঝতে পেরেছিলেন, চাঁদের মতো বীর ও নিষ্ঠাবান শিবভক্তের পূজা না পেলে উচ্চসমাজে তাঁর দেবীত্ব স্বীকৃতি পাবে না।তবুও  চাঁদ সওদাগর শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মনসাকে পূজা দিতে সম্মত হন, তবে তা দেন বামহাতে এবং মনসার দিকে না তাকিয়ে। এটি ছিল এক ধরনের ঐতিহাসিক আপস বা 'কম্প্রোমাইজ'।তবে-

      এই সংঘাত ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে অনার্য লোকদেবী মনসা আর্য দেবমণ্ডলীতে স্থান পান। এটি প্রমাণ করে কীভাবে মধ্যযুগের বাংলায় স্থানীয় লৌকিক বিশ্বাসগুলি ধীরে ধীরে মূলধারার পৌরাণিক হিন্দুধর্মের সাথে মিশে গিয়ে এক মিশ্র ও সমন্বিত বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...