Skip to main content

ভারতীয় রাজনীতিতে সমস্যাসমূহ।। রজনী কোঠারির 'রাজনীতিতে জাতপাত' (Politicization of Caste) সম্পর্কিত ধরনাটি লেখো ।

ভারতীয় রাজনীতিতে সমস্যাসমূহ।। রজনী কোঠারির 'রাজনীতিতে জাতপাত' (Politicization of Caste) সম্পর্কিত ধরনাটি লেখো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,সপ্তম সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর। ইউনিট টু,5।

       আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রজনী কোঠারি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ "Caste in Indian Politics" (১৯৭০)-এ ভারতের রাজনীতিতে জাতপ্রথার ভূমিকা নিয়ে এক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। আর সেই তত্ত্ব অনুসারে আমরা জানতে পারি যে- সাধারণ ধারণায় মনে করা হয় যে, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জাতপাত একটি পশ্চাৎপদ ও ক্ষতিকর উপাদান। কিন্তু রজনী কোঠারি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, গণতন্ত্র এবং জাতপাত একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। জাতপাত যেমন রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে, তেমনই রাজনীতিও জাতপাতকে আধুনিক রূপ দিচ্ছে। আর সেখানে-

    ১) জাতপাতের মূল তত্ত্ব হিসেবে দ্বিমুখী প্রক্রিয়ায় রজনী কোঠারির মতে, রাজনীতি এবং জাতপ্রথার পারস্পরিক সম্পর্ক একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। যেখানে রাজনীতির জাতকরণে রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচনে জেতার জন্য বিভিন্ন জাতের ভোটব্যাংক বা জাতভিত্তিক জোট তৈরি করে, তখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জাতপ্রথার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে-

         জাতপাতের রাজনৈতিকীকরণ আবার অন্যদিকে, জাতপাত তার পুরনো রূপ ভেঙে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। নিজের সম্প্রদায়ের উন্নয়ন ও অধিকার আদায়ের জন্য মানুষ রাজনৈতিক মঞ্চকে ব্যবহার করে।

     ২) রজনী কোঠারির তত্ত্বের মূল বৈশিষ্ট্যসমূহে দেখা যায়-গণতন্ত্র ও জাতপাতের মেলবন্ধন। যেখানে কোঠারি দেখিয়েছেন যে, ভারতের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন—নির্বাচন, রাজনৈতিক দল) কাজ করতে গিয়ে ঐতিহ্যগত সামাজিক কাঠামো অর্থাৎ 'জাত'-কে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।আসলে সেদিন এবং বর্তমানে জাতপাত ছাড়া রাজনীতিতে জনগণের বিশাল অংশের কাছে পৌঁছানো অসম্ভব ছিল। তাই দেখা দিল-

    রাজনীতিতে সংগঠিত শক্তিরূপে জাতপাত। জাতপাত কেবল সামাজিক বৈষম্যের উৎস নয়, এটি সাধারণ মানুষকে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার একটি সাংগঠনিক ভিত্তি বা প্ল্যাটফর্ম তৈরী করে দেয়।যার ফলে পিছিয়ে থাকা মানুষরা একত্রিত হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি প্রমাণ করতে পারে। তবে-

      আগে জাতপাত ছিল একটি স্থায়ী ও অনমনীয় সামাজিক স্তরবিন্যাস।যেখানে ছিল উঁচু-নিচু কঠোর ভেদাভেদ। কিন্তু রাজনীতির ছোঁয়ায় তা এখন প্রতিযোগিতামূলক স্বার্থের দলে ( পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন জাত নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য রাজনৈতিক দরকষাকষি শুরু করেছে। যার ফলে-

       রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে বিভিন্ন উপ-জাতি একত্রিত হয়ে বৃহত্তর জাতিগত জোটে পরিণত হয়। ফলে জাতের সংকীর্ণ গণ্ডি কিছুটা হলেও প্রসারিত হয়।

•রজনী কোঠারি তত্ত্বের তাৎপর্য ও সমালোচনা

     রজনী কোঠারীর জাতপাত তত্ত্বের মাধ্যমে বোঝা যায় কেন ভারতের মতো ঐতিহ্যবাহী সমাজে গণতন্ত্র সফল হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে জাতপাত রাজনীতির অন্তরায় নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি অংশ এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যম। কিন্তু-

      সমালোচকদের মতে, কোঠারির এই তত্ত্ব রাজনীতিতে জাতপাতের স্থায়িত্বকে কিছুটা বাড়িয়ে দেখেছে।যার ফলে সমাজে স্থায়ীভাবে জাতভিত্তিক মেরুকরণ, হানাহানি এবং সংকীর্ণ আঞ্চলিক স্বার্থকতা বৃদ্ধি পায়, যা জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী। আর সে কারণেই-

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে, রজনী কোঠারি দেখিয়েছেন যে আধুনিক রাজনীতিতে জাতপাতের অবলুপ্তি ঘটেনি, বরং তার রূপ পরিবর্তন ঘটেছে। তাই ভারতীয় গণতন্ত্রের বাস্তবতাকে বুঝতে হলে জাত ও রাজনীতির এই জটিল সম্পর্ককে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, বরং স্বীকার করা শ্রেয়।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...