Skip to main content

নির্বাচন কমিশন।। ভারতের নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী সংস্কার(Electoral Reforms in India) আলোচনা করো।

নির্বাচন কমিশন।। ভারতের নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনী সংস্কার(Electoral Reforms in India) আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় সপ্তম সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর।

      আমরা জানি যে,বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করার মূল দায়িত্ব সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) ওপর ন্যস্ত।আসলে স্বাধীন ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, শক্তিশালী এবং প্রযুক্তিমুখী করার জন্য সময়ের সাথে সাথে নির্বাচন কমিশন একাধিক নির্বাচনী সংস্কার গ্রহণ ও সুপারিশ করেছে। আর সেই নির্বাচনী সংস্কার গ্রহণ ও সুপারিশ গুলি হলো-

     •নির্বাচনী সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা।ভারতে প্রধানত চারটি 'M' (Money, Muscle, Media, and Mafia) এবং তিনটি 'C' (Corruption, Casteism, and Criminalization)-এর প্রভাব দূর করার লক্ষ্যে নির্বাচনী সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছিল।যেখানে কালো টাকার প্রভাব রোধ করার জন্য রাজনৈতিক অর্থায়ন ও মাত্রাতিরিক্ত নির্বাচনী খরচ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো অপরাধমূলক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা ব্যক্তিদের ভোটে অংশ নেওয়া আটকানো। শুধু তাই নয়, সেই সাথে ভোট গ্রহণ এবং গণনায় স্বচ্ছতা আনা এবং ভোটারদের স্বায়ত্তশাসন ও গোপনীয়তা রক্ষা।

    •নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গৃহীত প্রধান প্রধান নির্বাচনী সংস্কার।ভারতের নির্বাচনী সংস্কারের ইতিহাসকে মূলত তিনটি প্রধান পর্বে ভাগ করা যায়। যেখানে-

   • ক) ১৯৯৬ সালের পূর্ববর্তী সংস্কারসমূহ হলো -

     ১. ভোটাধিকারের বয়স হ্রাস (১৯৮৮): সংবিধানের ৬১তম সংশোধনী আইনের মাধ্যমে ভোটারদের সর্বনিম্ন বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করা হয় (১৯৮৯ সাল থেকে কার্যকরী)।

    ২. ভোটার পরিচয়পত্র (EPIC): ১৯৯৩ সালে বুথ জ্যামিং এবং ভুয়ো ভোট দেওয়া প্রতিরোধে ছবিসহ ভোটার পরিচয়পত্র (Elector's Photo Identity Card) চালু করা হয়।

    ৩. ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM): ১৯৮২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম ব্যবহারের পর ১৯৯০-এর দশকে ব্যাপক আকারে EVM-এর প্রবর্তন ঘটানো হয়।

    খ) ১৯৯৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যবর্তী সংস্কারসমূহ হলো-

     ১. নির্বাচনী আচরণবিধি (Model Code of Conduct - MCC): রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রচারের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার ও সাম্প্রদায়িক প্রচার বন্ধে নির্বাচনী আচরণবিধির কঠোর প্রয়োগ শুরু হয়।

     ২. হলফনামা প্রকাশ (Affidavit Filing - ২০০৩): সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রার্থীকে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কোনো ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড আছে কি না তা হলফনামার মাধ্যমে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হয়।

    ৩. প্রার্থীর কেন্দ্র সংখ্যা সীমিতকরণ: একজন প্রার্থী সর্বাধিক দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

     ৪. প্রচার পর্বের সময় কমানো: প্রচারের সময়সীমা ২০ দিন থেকে কমিয়ে ১৪ দিন করা হয়।

     গ) ২০১০ পরবর্তী আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সংস্কার সমূহ হলো-

    ১. NOTA (None of the Above - ২০১৩): প্রসেসে ভোটারদের অসন্তোষ প্রকাশের অধিকার দিতে EVM-এ 'নোটা' বিকল্প যুক্ত করা হয়।

     ২. VVPAT (Voter Verifiable Paper Audit Trail): ভোটিং প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে EVM-এর সাথে VVPAT যুক্ত করা হয়, যা ভোটারকে স্লিপের মাধ্যমে নিশ্চিত করে তাঁর ভোটটি সঠিক প্রার্থী পেয়েছেন।

     ৩. ডিজিটাল সেবা ও পোর্টাল: cVIGIL অ্যাপ (নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ জানানোর জন্য), Voter Helpline App এবং NVSP পোর্টালের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা।

    ৪. ভোটার কার্ডের সাথে আধার সংযুক্তি (২০২১): ভোটার তালিকার ডুপ্লিকেশন ও জালিয়াতি রোধে আধার সংযুক্তির কাজ শুরু হয়।

    •নির্বাচনী সংস্কার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটি সমূহ।নির্বাচন কমিশন ও ভারত সরকার বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সংস্কারগুলি গ্রহণ করেছে:

      • তারকুন্ডে কমিটি (১৯৭৫),যে কমিটি ভোটারদের বয়স ১৮ বছর করার সুপারিশ করে।দিনেশ গোস্বামী কমিটি (১৯৯০),যে কমিটি EVM ব্যবহার এবং রাজনৈতিক তহবিল সংক্রান্ত সুপারিশ করে।ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত কমিটি (১৯৯৮), যে কমিটি নির্বাচন পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন এর প্রস্তাব। এছাড়াও ল কমিশন অফ ইন্ডিয়া  রাজনীতির অপরাধীকরণ প্রতিরোধ ও রাজনৈতিক দলগুলির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র রক্ষার সুপারিশ করে।

•বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সুপারিশঃনির্বাচন কমিশন বহু সংস্কার বাস্তবায়ন করলেও কিছু ক্ষেত্রে এখনো সংস্কার প্রয়োজন। আর সেই সংস্কার গুলি হলো-

       রাজনৈতিক অনুদানে নাম প্রকাশহীনতা ও কালো টাকার প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ করা। সারা দেশে একসাথে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার ও পেইড নিউজ প্রতিরোধ করা।

      পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি গতিশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভারতীয় গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করতে ক্রমাগত কাজ করে চলেছে। প্রযুক্তিগত ব্যবহার, আইনি পদক্ষেপ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন যে সংস্কারসমূহ এনেছে, তা ভারতীয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে বিশ্বমঞ্চে এক অনুকরণীয় উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...