বিবর্তনবাদ কী? পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার সমাজবিদ্যা মাইনর।মান ৫
সমাজবিদ্যায় বিবর্তনবাদ (Evolutionary Theory) বা সামাজিক বিবর্তনবাদ (Social Evolutionism) হলো এমন একটি তত্ত্ব, যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে মানব সমাজ সহজ ও সরল রূপ থেকে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের মাধ্যমে জটিল, উন্নত ও আধুনিক রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে।
জীববিজ্ঞানে চার্লস ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজাতির জৈবিক বিবর্তনের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯ শতকের সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজ মূল্যায়নে এই তত্ত্ব প্রয়োগ করেন।
সামাজিক বিবর্তনবাদের প্রধান দিক ও বৈশিষ্ট্য
* সরল থেকে জটিল রূপান্তর: আদিম মানব সমাজ ছিল অত্যন্ত সরল প্রকৃতির—যেখানে কাজের বিভাগ বা বিভাজন কম ছিল। সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার বিকাশ, প্রযুক্তির প্রসার ও চাহিদার পরিবর্তনের ফলে সমাজ ধীরে ধীরে বহুবিধ ও জটিল সংগঠনে রূপ নেয়।
* ধারাবাহিক উন্নয়ন: সামাজিক উন্নয়ন বা পরিবর্তন এক দিনে ঘটে না। এটি নির্দিষ্ট কিছু স্তরের (Stages) মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে এবং ধারাবাহিকভাবে ঘটে থাকে।
* একমুখী গতি (Unilinear Evolution): প্রারম্ভিক বিবর্তনবাদীদের মতে, পৃথিবীর সমস্ত সমাজ মূলত একই ধরনের ধাপ বা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে আধুনিক সমাজব্যবস্থায় পৌঁছায়।
প্রধান চিন্তাবিদ ও তাঁদের মতামত
১. হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer):
সমাজবিজ্ঞানে বিবর্তনবাদের প্রয়োগে তিনি পথপ্রদর্শক। তিনি "সামাজিক জৈব তত্ত্ব" (Organic Analogy) প্রদান করে বলেন—একটি জীবদেহের কোষ যেমন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে জটিল অঙ্গে পরিণত হয়, সমাজও ঠিক তেমনি একটি সরল প্রতিষ্ঠান থেকে জটিল ও বিশেষায়িত সংস্থায় রূপান্তরিত হয়।
২. এল. এইচ. মরগান (L. H. Morgan):
তিনি মানব সমাজের বিবর্তনকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন:
* বর্বরতা বা বন্য দশা (Savagery)
* অসভ্য দশা (Barbarism)
* সভ্য দশা (Civilization)
৩. ই. বি. টেইলর (E. B. Tylor):
তিনি সংস্কৃতির বিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাস জাদুবিদ্যা (Magic) থেকে ধাপে ধাপে উঠে এসে একশ্বরবাদে রূপ নিয়েছে।
উপসংহার
সামাজিক বিবর্তনবাদ ১৯ শতকের সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। যদিও পরবর্তীকালে বিবর্তনবাদীদের এই "একমুখী অগ্রগতি"র ধারণাকে অনেক নৃতাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী সমালোচনা করেছেন, তবুও সমাজ পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী ধারা বোঝার ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব আজও সমাজবিদ্যার একটি ভিত্তিপ্রস্তর।
Comments
Post a Comment