Skip to main content

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত সামাজিক চুক্তি মতবাদটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর।

     আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রাষ্ট্রের উৎপত্তি সংক্রান্ত কৃত্রিম বা মানবসৃষ্ট মতবাদগুলির মধ্যে 'সামাজিক চুক্তি মতবাদ' সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য।আর এই মতবাদের মূল কথা হলো রাষ্ট্র কোনো ঈশ্বরসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক প্রতিষ্ঠান নয়; মানুষ নিজেদের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠন করেছে।যেখানে এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা হলেন-

 তিন জন চুক্তিবাদী দার্শনিক। তাঁদের মধ্যে থমাস হব্‌স হলেন অন্যতম চুক্তিবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। যার শ্রেষ্ঠ  গ্রন্থ হলো-'Leviathan' (১৬৫১)

 * জন লক (John Locke) — গ্রন্থ: 'Two Treatises of Government' (১৬৮৯)

 * জঁ জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) — গ্রন্থ: 'The Social Contract' (১৭৬২)

৩. মূল রূপরেখা:

 * (ক) প্রকৃতির রাজ্য (State of Nature): রাষ্ট্র গঠনের পূর্বে মানুষ যেখানে বাস করত, তাকে 'প্রকৃতির রাজ্য' বলা হয়। সেখানে কোনো আইন বা সরকার ছিল না।

   * হব্‌স: প্রকৃতির রাজ্য ছিল হিংস্র, বিশৃঙ্খল ও যুদ্ধসংকুল। মানুষ ছিল স্বার্থপর এবং তাদের জীবন ছিল "একাকী, দরিদ্র, পশুভাবাপন্ন ও ক্ষণস্থায়ী"।

   * লক: প্রকৃতির রাজ্য ছিল শান্তিময় ও সহযোগিতাপূর্ণ। মানুষ সেখানে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির প্রাকৃতিক অধিকার ভোগ করত।

   * রুশো: প্রকৃতির রাজ্য ছিল স্বর্গীয় ও স্বাধীন। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটায় সমাজে হিংসা ও শোষণের সূচনা হয়।

 * (খ) চুক্তি সম্পাদনা (The Social Contract): প্রকৃতির রাজ্যের নৈরাজ্য বা নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ চুক্তির মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করে।

   * হবসের চুক্তি: মানুষ তাদের সমস্ত শাসনক্ষমতা একজন নিরঙ্কুশ শাসকের হাতে তুলে দেয়।

   * লকের চুক্তি: লক দুটি চুক্তির কথা বলেন—প্রথমটি 'সামাজিক চুক্তি' (সমাজ গঠনের জন্য) এবং দ্বিতীয়টি 'সরকারি চুক্তি' (সরকার গঠনের জন্য)।

   * রুশোর চুক্তি: মানুষ তাদের অধিকার সমগ্র সমাজের কাছে সমর্পণ করে 'সাধারণ ইচ্ছা' (General Will) গঠন করে।

 * (গ) ক্ষমতার প্রকৃতি:

   * হব্‌স সমর্থন করেন একচ্ছত্র রাজতন্ত্র।

   * লক সমর্থন করেন সীমিত ও সংবিধানসম্মত সরকার।

   * রুশো সমর্থন করেন জনপ্রিয় সার্বভৌমিকতা (প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র)।

৪. সংক্ষিপ্ত তুলনা:

| বিষয় | হব্‌স (Hobbes) | লক (Locke) | রুশো (Rousseau) |

|---|---|---|---|

| প্রকৃতির রাজ্য | হিংস্র ও নৈরাজ্যময় | শান্তিময়, তবে অনিশ্চিত | স্বাধীন, কিন্তু সম্পত্তি আসায় কলুষিত |

| চুক্তির সংখ্যা | ১টি (জনগণের নিজেদের মধ্যে) | ২ টি (সামাজিক ও সরকারি) | ১টি (জনগণ ও সমগ্র সমাজের মধ্যে) |

| সার্বভৌমত্ব | নিরঙ্কুশ ও একচ্ছত্র | সীমিত ও দায়বদ্ধ | জনগণের 'সাধারণ ইচ্ছা' |

৫. সমালোচনা:

১. ঐতিহাসিক ভিত্তিহীন: ইতিহাসের কোনো প্রমাণ নেই যে মানুষ কখনো চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র তৈরি করেছিল। রাষ্ট্র বিবর্তনের ফল।

২. অযৌক্তিক: রাষ্ট্রহীন অনগ্রসর মানুষ কীভাবে রাষ্ট্র ও চুক্তির জটিল ধারণা বুঝতে পেরেছিল—তা ব্যাখ্যাতীত।

৩. প্রাকৃতিক অধিকার ভ্রান্ত: রাষ্ট্র ও আইন ছাড়া কোনো অধিকার সুরক্ষিত হতে পারে না।

৬. গুরুত্ব ও উপসংহার:

সমালোচিত হলেও, এই মতবাদ রাজাদের 'ঐশ্বরিক অধিকার মতবাদ' বা অন্ধবিশ্বাসকে চূর্ণ করে প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস ঈশ্বর নন, বরং জনগণের সম্মতি। লকের সীমিত সরকার ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রের এবং রুশোর 'সাধারণ ইচ্ছা' ফরাসি বিপ্লবের মূল প্রেরণা ছিল।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...