পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম সেমিস্টার বাংলা মেজরের জন্য 'কেবল মন বাঁধা দিতেই আসি' উক্তিটির প্রেক্ষিতে পরাধীন বাঙালির দাসত্ববৃত্তি ও গদ্যশৈলী সম্পর্কিত ১০ নম্বরের উপযুক্ত উত্তরটি তৈরি করে দাও।
উত্তর:
ভূমিকা: ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও সমাজচিন্তক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাস্যরসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক গদ্যসংকলন ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এর একটি অন্যতম প্রধান ভাবাশ্রয়ী রচনা হলো ‘আমার মন’। পরাধীন ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সভ্যতার অন্ধ অনুকরণে রত বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজের আত্মিক পরাধীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং তীব্র দাসত্ববৃত্তিকে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর আফিমখোর রূপক চরিত্র কমলাকান্তের মাধ্যমে পরম নিপুণতায় উন্মোচিত করেছেন। প্রবন্ধে কমলাকান্তের ক্ষোভ ও খেদমিশ্রিত উচ্চারণ— "আমরা কি করিতে আসি, তাহা ঠিক বলিতে পারি না—কিন্তু বোধ হয়, কেবল মন বাঁধা দিতেই আসি।" — তৎকালীন বঙ্গীয় সমাজের দাসমনোবৃত্তির ওপর এক তীব্র চাবুক এবং একই সঙ্গে বঙ্কিমী গদ্যশৈলী ও শ্লেষাত্মক (Satire) রূপকের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১. 'মন বাঁধা দেওয়া' এবং পরাধীন বাঙালির দাসত্ববৃত্তি
ব্রিটিশ শাসনাধীন ১৯ শতকের বাংলায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ নিজেদের পরিচয় ও আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়েছিল ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে। কেরানিগিরি, পদমর্যাদা বা সামান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে তারা সাহেবি শাসনের গোলামি স্বীকার করে নিয়েছিল।
- আত্মমর্যাদার বিসর্জন: কমলাকান্তের মতে, মানুষ জন্মায় মুক্ত ও স্বাধীন মন নিয়ে। কিন্তু উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ কেবল জীবিকা নির্বাহ বা সাহেবদের অনুগ্রহ লাভের আশায় নিজেদের স্বাধীন চিন্তা, বিবেক ও আত্মসম্মানকে বন্ধক দিয়েছিল। এই মানসিক পরাধীনতাকেই প্রাবন্ধিক "মন বাঁধা দেওয়া" বলে চিহ্নিত করেছেন।
- শিক্ষার বিকৃতি: তৎকালীন আধুনিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল মনের মুক্তি ও জ্ঞানার্জন। কিন্তু বাঙালি সমাজের কাছে তা পরিণত হয়েছিল কেবল উপার্জনের এবং তোষামোদের হাতিয়ারে।
- বুদ্ধিজীবীদের দেউলিয়াপনা: যারা সমাজের নেতা বা দিশারী হওয়ার কথা ছিল, সেই শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণিই সাহেবের চাটুকারিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। নিজেদের বিচারবুদ্ধি ইংরেজ প্রভুর কাছে সমর্পণ করাকেই কমলাকান্ত চরম করুণ রসাত্মক ভঙ্গিতে ব্যঙ্গ করেছেন।
২. কমলাকান্ত চরিত্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের গদ্যশৈলী
‘আমার মন’ প্রবন্ধের মূল শক্তি কেবল তার সামাজিক বিষয়বস্তু নয়, বরং এর অভিনব গদ্যরীতির উপস্থাপন। রাজরোষ এড়াতে এবং একই সঙ্গে সমাজকে সতর্ক করতে বঙ্কিমচন্দ্র বিশেষ কিছু সাহিত্যিক কৌশল ব্যবহার করেছেন:
(ক) আফিমের নেশা ও রূপকের আড়াল (Irony & Allegory)
বঙ্কিমচন্দ্র সরাসরি সোজা কথায় ঔপনিবেশিক শাসন বা পরাধীন সমাজের সমালোচনা করলে রাজদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত হতে পারতেন। তাই তিনি কমলাকান্তকে এক 'আফিমখোর পাগল' হিসেবে খাড়া করেছেন। নেশাগ্রস্ত মানুষের অসংলগ্ন কথার ছদ্মবেশে বঙ্কিমচন্দ্র এমন সব চরম সামাজিক সত্য উচ্চারণ করেছেন, যা সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে বলা কঠিন ছিল।
(খ) শ্লেষ ও বক্রোক্তি (Satire & Wit)
প্রবন্ধটিতে হাস্যরসের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে তীব্র বিষাদ ও ক্ষোভ। কমলাকান্ত কখনো প্রসন্ন গোয়ালিনীর গরু, কখনো বা সুন্দরী যুবতীর রূপকের মাধ্যমে মনের চঞ্চলতা ও বিক্রি হয়ে যাওয়ার গল্প ফাঁদে। কিন্তু প্রতিটি লঘু কৌতুকের গভীরে লুকিয়ে থাকে পরাধীন জাতির করুণ বাস্তবতার কশাঘাত।
(গ) প্রাঞ্জল ও ব্যঞ্জনাময় ভাষা
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর গুরুগম্ভীর ঐতিহাসিক উপন্যাসের গদ্য থেকে সরে এসে ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এ অত্যন্ত সহজ-সরল, কথ্য শব্দপ্রয়োগ এবং তীক্ষ্ণ ব্যঞ্জনাময় গদ্যরীতির ব্যবহার করেছেন। ছোট ছোট বাক্য, সোজা প্রশ্ন এবং নাটকীয় সংলাপের মাধ্যমে পাঠককে গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করাই এই গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
৩. উপযোগিতা ও চিরন্তন তাৎপর্য
কমলাকান্তের এই আক্ষেপ কেবল উনিশ শতকের পরাধীন ভারতের জন্যই সত্য নয়, এটি যেকোনো যুগের সামাজিক দাসত্ব ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক চিরন্তন সত্য। পরাধীন বাঙালি বৈষয়িক উন্নতির লোভে কীভাবে নিজের ভেতরের আত্মাকে বিকিয়ে দিয়েছিল, তা অনুধাবন করে কমলাকান্ত শেষ পর্যন্ত নিজের মনকে অন্যের কাছে বিকিয়ে না দিয়ে নিজের অন্তর্জগতে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, "কেবল মন বাঁধা দিতেই আসি" — এই একটি উক্তির মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র পরাধীন বঙ্গদেশের মানসিক পঙ্গুত্বকে যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনই বক্রোক্তি ও ব্যঙ্গাত্মক গদ্যরীতির চরম উৎকর্ষ ঘটিয়েছেন। কমলাকান্তের আফিমখোর সুলভ প্রলাপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধ ‘আমার মন’ প্রবন্ধটিকে বাংলা সাহিত্য তথা পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এক কালজয়ী মর্যাদা দান করেছে।
Comments
Post a Comment