Skip to main content

সমাজতত্ত্ব।।সামাজিক পরিবর্তন(Social Change) এবং সামাজিক সচলতার (Social Mobility) ওপর টীকাপশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় - প্রথম সেমিস্টার, সমাজতত্ত্ব মাইনর।

সমাজতত্ত্ব।।সামাজিক পরিবর্তন(Social Change) এবং সামাজিক সচলতার (Social Mobility) ওপর টীকাপশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় - প্রথম সেমিস্টার, সমাজতত্ত্ব মাইনর।

      আলোচনা শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় সামাজিক পরিবর্তন (Social এবং সামাজিক সচলতা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গতিশীল ধারণা।আসলে আমাদের এই সমাজ সমাজ কোনো স্থির বা অচলায়তন ব্যবস্থা নয়; বরং বলা যেতে পারে তা প্রতিনিয়ত রূপান্তরিত ও পরিবর্তনশীল। আর এই প্রেক্ষিতে সামাজিক কাঠামোর এই পরিবর্তন এবং সেই কাঠামোর মধ্যে ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর অবস্থানের পরিবর্তন সমাজবিজ্ঞানে গভীরভাবে আলোচিত হয়। তাই এই আলোচনাকে সামনে রেখে আমরা আলোচনা করতে পারি-

২. সামাজিক পরিবর্তনঃ সমাজবিজ্ঞানী মেকাইভার ও পেজ-এর মতে, "সামাজিক পরিবর্তন হলো সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তন।" অর্থাৎ, সামাজিক রীতিনীতি, মূল্যবোধ, প্রতিষ্ঠান এবং কাঠামোর মধ্যে যে রূপান্তর ঘটে, তাকেই সামাজিক পরিবর্তন বলা হয়।

(খ) বৈশিষ্ট্য:

  • সার্বজনীনতা: বিশ্বের প্রতিটি সমাজেই পরিবর্তন ঘটে, তা দ্রুত বা ধীরগতির হতে পারে।
  • গতিশীলতা: সমাজ পরিবর্তনের গতি সব সময় সমান থাকে না।
  • অনিয়ন্ত্রণযোগ্যতা: সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে আগে থেকে পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন।

(গ) পরিবর্তনের মূল কারণ বা উপাদান:

১. প্রযুক্তিগত উপাদান: শিল্পায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং প্রযুক্তির বিকাশ সমাজের কাজের ধরন ও সম্পর্ক বদলে দিয়েছে। ২. জনসংখ্যাগত উপাদান: জন্মহার, মৃত্যুহার এবং পরিব্রাজনের (Migration) ফলে সামাজিক কাঠামো প্রভাবিত হয়। ৩. সাংস্কৃতিক উপাদান: নতুন চিন্তাধারা, শিক্ষা ও মূল্যবোধের প্রসারে সমাজ পরিবর্তিত হয়। ৪. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপাদান: সরকারি নীতি, বিপ্লব ও অর্থনৈতিক রূপান্তর সমাজের পরিবর্তনের পথ সুগম করে।

৩. সামাজিক সচলতা (Social Mobility)

(ক) সংজ্ঞা ও ধারণা:

সমাজবিজ্ঞানী পি. এ. সোরোকিন (P. A. Sorokin)-এর মতে, সামাজিক স্তরবিন্যাস কাঠামোর মধ্যে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা পরিবারের সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তনকে সামাজিক সচলতা বলা হয়।

(খ) সামাজিক সচলতার প্রকারভেদ:

সামাজিক সচলতাকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:

সচলতার ধরনব্যাখ্যা ও উদাহরণ
অনুভূমিক সচলতা (Horizontal Mobility)পদমর্যাদার স্তর পরিবর্তন না করে কেবল অবস্থান পরিবর্তন। যেমন: এক স্কুলের শিক্ষক অন্য স্কুলে একই পদে যোগ দেওয়া।
উল্লম্ব সচলতা (Vertical Mobility)সামাজিক স্তরায়ন বা মর্যাদার উচ্চ বা নিম্ন পরিবর্তন। • ঊর্ধ্বমুখী (Upward): ক্লার্ক থেকে অফিসার হওয়া। • নিম্নমুখী (Downward): ব্যবসায়ে ক্ষতির ফলে পদমর্যাদা হ্রাস পাওয়া।
আন্তঃপ্রজন্ম সচলতা (Inter-generational)বাবা-মায়ের তুলনায় সন্তানের সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন।
অন্তঃপ্রজন্ম সচলতা (Intra-generational)একজন ব্যক্তির নিজের জীবদ্দশায় সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন।

(গ) সচলতার সহায়ক উপাদান:

  • শিক্ষা: আধুনিক সমাজে সচলতার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো গুণগত শিক্ষা।
  • নগরায়ন ও শিল্পায়ন: জাতিভেদ বা বংশানুক্রমিক বাঁধা দূর করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ প্রদান করে।
  • অর্থনৈতিক সুযোগ: নতুন কাজের সুযোগ ও আয়ের বৃদ্ধি সামাজিক মর্যাদা বাড়ায়।

৪. সামাজিক পরিবর্তন ও সামাজিক সচলতার মধ্যকার সম্পর্ক

সামাজিক পরিবর্তন এবং সামাজিক সচলতা একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত:

  • পরিবর্তন সচলতা বাড়ায়: সমাজ যখন সনাতন বা বন্ধ (Closed System) অবস্থা থেকে আধুনিক বা মুক্ত (Open System) সমাজের দিকে রূপান্তরিত হয়, তখন সামাজিক সচলতার সুযোগ অনেক বৃদ্ধি পায়।
  • উদাহরণ: ঐতিহ্যবাহী ভারতে 'জাতি ব্যবস্থা' (Caste System) সচলতাকে আটকে রাখত। কিন্তু আধুনিক ভারতে শিক্ষার প্রসার, নগরায়ন এবং আইনের পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে, যার ফলে বর্তমানে 'শ্রেণিভিত্তিক' (Class System) সামাজিক সচলতা বহুগুণ বেড়েছে।

৫. উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, সামাজিক পরিবর্তন হলো সামষ্টিক কাঠামোর রূপান্তর, আর সামাজিক সচলতা হলো সেই কাঠামোর ভেতরে ব্যক্তির অবস্থানের পরিবর্তন। এই দুটি প্রক্রিয়াই সমাজকে জীবন্ত ও পরিবর্তনশীল রাখে। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মতো উন্নয়নশীল সমাজে বর্তমানে শিক্ষা ও প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমে এই দুটি প্রক্রিয়াই অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

পরামর্শ: পরীক্ষায় ১০ নম্বরের উত্তর হিসেবে স্পষ্ট পয়েন্ট ও ছক ব্যবহার করলে উত্তরের মান ও নম্বর প্রাপ্তির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত কোনো স্পষ্টীকরণ প্রয়োজন থাকলে জানান।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...