Skip to main content

সামাজিকীকরণ (Socialization) বলতে কী বোঝায়? সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে পরিবার, বিদ্যালয় এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা আলোচনা করো।

সামাজিকীকরণ (Socialization) বলতে কী বোঝায়? সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে পরিবার, বিদ্যালয় এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিদ্যা প্রথম সেমিস্টার মাইনর।

        আমরা জানি যে,সামাজিকীকরণ (Socialization) হলো এমন একটি জীবনব্যাপী ও অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি সমাজস্থ অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে সমাজের নিয়মকানু, মূল্যবোধ, প্রথা, সংস্কৃতি এবং আচরণের ধরণগুলো শেখে ও নিজের মধ্যে আয়ত্ত করে। সহজ কথায়, জন্মলগ্নে একজন শিশু কেবল একটি জৈবিক সত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, কিন্তু সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়েই সে একজন পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মানুষে পরিণত হয়।আর সেখানে সামাজিকীকরণের তিনটি অন্যতম প্রধান বাহন হলো পরিবার, বিদ্যালয় এবং গণমাধ্যম।আর এদের ভূমিকা নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো - 

    ১. সামাজিকীকরণে পরিবারের ভূমিকাঃ পরিবার হলো সামাজিকীকরণের প্রথম এবং প্রাথমিক মাধ্যম (Primary Agent)। মানবজীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল পর্যায়ে পরিবারই শিশুর বিকাশের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে।

     • প্রাথমিক মূল্যবোধ ও প্রথা শিক্ষাঃশিশু পরিবার থেকেই সত্যবাদিতা, অনুভূতিশীলতা, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ করা এবং শৃঙ্খলা শেখায়।

      • ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিকাশঃ শিশুর মাতৃভাষা শেখা, কথা বলার ধরন এবং নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় সম্পূর্ণভাবে পরিবারের মাধ্যমেই ঘটে।

     • আবেগীয় নিরাপত্তা ও আত্মপরিচয়ঃবাবা-মা ও ভাই-বোনের ভালোবাসা শিশুকে মানসিক ও আবেগীয় দিক থেকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তার মধ্যে 'আমি' এবং 'আমরা' চেতনার উন্মেষ ঘটে।

     • লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকাঃ পরিবারের সদস্যরাই পরোক্ষভাবে শিশুকে তার সমাজে প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার প্রাথমিক ধারণা দেয়।

      ২. সামাজিকীকরণে বিদ্যালয়ের ভূমিকাঃ শিশুর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সে পরিবারের বাইরে যে প্রতিষ্ঠানে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়, তা হলো বিদ্যালয়। এটি সামাজিকীকরণের একটি মাধ্যমিক মাধ্যম।

      • আনুষ্ঠানিক জ্ঞান ও শৃঙ্খলা শিক্ষাঃ বিদ্যালয় শিশুকে পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানের পাশাপাশি সঠিক নিয়মকানুন, সময়ানুবর্তিতা এবং আত্মসংযম শেখায়।

     • সহপাঠী গোষ্ঠী বা 'পিয়ার গ্রুপ'-এর প্রভাবঃ বিদ্যালয়ে সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করার ফলে শিশু ভাগ করে নেওয়া, প্রতিযোগিতা করা, সহমর্মিতা এবং দলগত কাজের শিক্ষা পায়।

     • সর্বজনীন মূল্যবোধ গঠনঃ পরিবার শিশুকে কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি শেখায়, কিন্তু বিদ্যালয় শিশুর সামনে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, ধর্ম ও ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুকে তুলে ধরে তার চিন্তাধারাকে সার্বজনীন করে তোলে।

    • প্রচ্ছন্ন পাঠ্যক্রমঃ লিখিত পাঠ্যসূচির বাইরেও জাতীয় পতাকাকে সম্মান জানানো, শিক্ষকদের মান্য করা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা করার মাধ্যমে শিশু সমাজের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।

    ৩. সামাজিকীকরণে গণমাধ্যমের ভূমিকাঃ বর্তমান আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিকীকরণের মাধ্যম হিসেবে গণমাধ্যমের (সংবাদপত্র, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, রেডিও এবং বর্তমানের সোশ্যাল মিডিয়া) প্রভাব অপরিসীম।

    • তথ্য ও সচেতনতার বিস্তারঃ সংবাদপত্র ও সংবাদের মাধ্যমে ব্যক্তি দেশ-বিদেশের নানা ঘটনা, সরকারের নীতি এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে সম্যক ধারণা ও জ্ঞান লাভ করে।

     • সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও বিশ্বায়নঃ টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমাজ, কালচার, ফ্যাশন এবং জীবনযাত্রার প্রভাব মানুষের চিন্তা-ভাবনায় পড়ে।

    • মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনঃরাজনীতি, সামাজিক সংস্কার বা কোনো বিশেষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে গণমাধ্যম অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।

 • সোশ্যাল মিডিয়ার সমসাময়িক প্রভাবঃফেসবুক, ইউটিউব, বা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কেবল শিশু বা কিশোর নয়, সমস্ত বয়সের মানুষের আচার-আচরণ, চিন্তাধারা ও সামাজিক যোগাযোগের ধরণ সম্পূর্ণ বদলে দিচ্ছে।

           পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,সামাজিকীকরণ কোনো নির্দিষ্ট বয়সে থেমে থাকে না; তবে শৈশব ও কৈশোরে পরিবার শিশুর ব্যক্তিত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে, বিদ্যালয় তাকে কাঠামোগত সামাজিক রূপ দেয় এবং গণমাধ্যম তাকে আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তনশীল সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...