Skip to main content

চন্ডীমঙ্গল(2nd.Sem, CC2) কাব্যের আখেটিক খণ্ড অবলম্বনে কালকেতুর চরিত্র আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, দ্বিতীয় সেমিস্টার, বাংলা মেজর)

চন্ডীমঙ্গল কাব্যের আখেটিক খণ্ড অবলম্বনে কালকেতুর চরিত্র আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, দ্বিতীয় সেমিস্টার, বাংলা মেজর)

             আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল কাব্যের আখেটিক খন্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র কালকেতু। ব্যাধ পরিবারে জন্ম নেওয়া কালকেতু কিভাবে দৈব কৃপায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং পরবর্তীতে নিজের বীরত্ব ও প্রজা প্রীতির মাধ্যমে একজন আদর্শ রাজারূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।আর সেই বিষয়টি কবি আখেটিক খন্ডে অপূর্ব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই পটভূমিতে কালকেতুর চরিত্রটি নিম্ন সূত্রাকারে আলোচনা করা যেতে পারে। যেখানে কালকেতু-

• কঠোর পরিশ্রমী ও দক্ষ ব্যাধঃ চন্ডীমঙ্গল কাব্যের আখেটিক খন্ডের শুরুতেই কালকেতুকে একজন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও দক্ষ ব্যাধ রূপে আমরা দেখতে পাই।যার প্রতিদিন গভীর জঙ্গলে গিয়ে পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় ছিল । আর এই জীবিকার মধ্যে থাকার ফলে বন্য পশুদের গতিবিধি সম্পর্কে তার অগাধ জ্ঞান ছিল এবং তীর-ধনুকে তার নিপুণ দক্ষতা ছিল। কঠিন পরিস্থিতিতেও শিকার করার অদম্য সাহস তার চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

         • দেব বিশ্বাসে আস্থাঃ  কালকেতু দেবী চন্ডীর প্রতি গভীর বিশ্বাস পোষণ করতেন। জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে দেবীর অলৌকিক কৃপা তিনি প্রত্যক্ষ করেন। আর সেই দেবীর স্বপ্নাদেশ এবং পরবর্তীতে গুপ্তধন লাভ তার জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই ঘটনা কালকেতুর চরিত্রে দৈবের উপর নির্ভরশীলতা এবং বিশ্বাসকে স্পষ্ট করে তোলে।

            •সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনঃ প্রবল  দরিদ্র ব্যাধ পরিবারে জন্ম নেওয়ার ফলে কালকেতুর জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর। জঙ্গলের কঠিন পরিবেশে থেকেও তিনি কোনো প্রকার বিলাসিতা বা জটিলতা পছন্দ করতেন না। তবে এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে,দেবীর কৃপা লাভের পূর্বে তার জীবন ছিল নিতান্তই সাধারণ একজন বনবাসীর মতো আড়ম্বরহীন।

            • ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধঃ  চন্ডীমঙ্গল কাব্যে আখেটিক খন্ডে কালকেতুর তার স্ত্রী ফুল্লরার প্রতি ছিল গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। তাদের দরিদ্র সংসারে স্ত্রী ফুল্লরা ছিলেন তার প্রধান সহায়ক। শিকারের পর অর্জিত সামান্য আয়েই তারা সংসার নির্বাহ করতেন। তবুও কালকেতু স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। শুধু তাই নয়, তাদের দুজনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলেন কালকেতু।

            •ভাগ্য পরিবর্তন ও দায়িত্ব গ্রহণঃ  দেবী চন্ডীর কৃপায় কালকেতু যখন অপ্রত্যাশিত ধন লাভ করেন, তখন তিনি সেই পরিবর্তনকে সহজে গ্রহণ করেন। বলা যায় এই ধনসম্পদ তার জীবনের মোড়কে ঘুরিয়ে দেয় এবং তাকে নতুন পথে চালিত করে। ভাগ্যের এই আকস্মিক পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তার চরিত্রের দৃঢ়তা প্রমাণ করে।

             •স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাঃ কালকেতু গুপ্তধন লাভ তার মধ্যে একটি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন জেগে ওঠে। তিনি কেবল নিজের আর্থিক উন্নতি চাননি, বরং একটি নতুন বসতি স্থাপন এবং সেখানে একটি উন্নত জীবন গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে পরবর্তীকালে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে অনুপ্রাণিত করে।

              পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে,চন্ডীমঙ্গল কাব্যের আখেটিক খন্ডে কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী কালকেতুকে একজন কঠোর পরিশ্রমী, দৈববিশ্বাসী, সরল জীবনযাপনকারী এবং স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে চরিত্রটি চিত্রিত করেছেন।আর সেখানে অপ্রত্যাশিত ভাগ্য পরিবর্তনকে গ্রহণ করে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার এবং সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ার মানসিকতা তার চরিত্রকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তোলে। আসলে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের আখেটিক খন্ডে কালকেতুর চরিত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়, যা পরবর্তী খন্ড গুলোতে তার রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের ক্ষেত্র পথ অনেকটাই প্রশস্ত করে দেয়।

•ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, ব্যাখ্যা, ভিডিও ও সাজেশন পেতে ভিজিট করতে পারেন SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel ।


Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...