Skip to main content

মধুসূদন দত্তের সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা হিসেবে 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর' কবিতার সার্থকতা আলোচনা করো ।

মধুসূদন দত্তের সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা হিসেবে 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর' কবিতার সার্থকতা আলোচনা করো (পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মাইনর সিলেবাস)।

          বাংলা সাহিত্যে সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তক হলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ইতালীয় কবি পেত্রার্কের আদর্শে তিনি বাংলা ভাষায় এই নতুন কাব্যরীতির প্রবর্তন করেন। তাঁর ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’র অন্তর্গত অন্যতম শ্রেষ্ঠ সনেট হলো ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’। এই কবিতায় সনেটের গঠনগত ও ভাবগত বৈশিষ্ট্যগুলি কীভাবে সার্থক হয়েছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো।

        ১) গঠনগত বৈশিষ্ট্যঃএকটি আদর্শ সনেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নির্দিষ্ট গঠনকাঠামো। ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ কবিতাটিতে সেই গঠনটি নিপুণভাবে অনুসৃত হয়েছে। কবিতাটি মোট ১৪টি চরণে বা পঙ্ক্তিতে বিন্যস্ত। সনেটের প্রথা অনুযায়ী প্রতিটি পঙ্ক্তি ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দে (বা পয়ারের প্রসারিত রূপ) রচিত।কবিতাটি দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত— প্রথম আট পঙ্ক্তিকে বলা হয় অষ্টক (Octave) এবং শেষ ছয় পঙ্ক্তিকে বলা হয় ষটক (Sestet)।

         ২)অন্ত্যমিল বিন্যাসঃমধুসূদন এই সনেটে পেত্রার্কীয় রীতির অনুকরণে অন্ত্যমিল ব্যবহার করেছেন। কবিতাটির মিল বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়-অষ্টকের মিল-ক খ খ ক / ক খ খ ক। (ভারতে-মনে-ক্ষণে-করতে / সরতে-জনে-গোপনে-হিমাদ্রিতে)।ষটকের মিল-গ ঘ গ / ঘ গ ঘ। (তেমনি-করে-আপনি / অম্বরে-মণি-ভরে)।আর এই সুশৃঙ্খল মিল বিন্যাস কবিতাটিকে একটি ধ্রুপদী সংহতি দান করেছে।

        ৩)ভাবগত বিবর্তনঃ সনেটের একটি বিশেষ গুণ হলো ভাব-সংহতি। ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ কবিতাটিতে এই ভাবের চমৎকার উত্তরণ ঘটেছে।আর সেখানে আমারা দেখি- 

     •অষ্টকে ভাবের প্রবর্তনাঃপ্রথম আট লাইনে কবি বিদ্যাসাগরের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মহিমা বর্ণনা করেছেন। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য (বিদ্যার সাগর) এবং দয়া (করুণার সিন্ধু)-এই দুটি দিককে এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।

     •ষটকে ভাবের পরিণতিঃশেষ ছয় লাইনে কবি উপমার মাধ্যমে এই গুণের প্রভাব বর্ণনা করেছেন। আকাশের সূর্য যেমন জগতকে আলো দেয়, বিদ্যাসাগরের মহিমাও তেমনই ভারতের আকাশকে উজ্জ্বল করে রেখেছে। এই যে ভাবের শুরু থেকে পরিসমাপ্তি-এটি একটি সার্থক সনেটের লক্ষণ

           সনেটের বিষয়বস্তু সাধারণত গভীর ও গম্ভীর হয়। মধুসূদন তাঁর এই সনেটে বিদ্যাসাগরের হিমালয়তুল্য ব্যক্তিত্বকে বর্ণনা করতে গিয়ে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ তৎসম শব্দ ব্যবহার করেছেন। কবির ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতাবোধ এখানে একটি সার্বজনীন রূপ পেয়েছে। অহেতুক শব্দের বিস্তার নেই, বরং প্রতিটি শব্দই বিদ্যাসাগরের বিশালতাকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছে।

         মধুসূদন এই সনেটে সার্থক চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। বিদ্যাসাগরকে তিনি ‘হিমাদ্রি’ (হিমালয়) এবং তাঁর কীর্তিকে ‘হেমকান্তি’ বা সুবর্ণ আভার সঙ্গে তুলনা করেছেন। সনেটের সীমিত পরিসরে এমন সংহত উপমা ব্যবহার করার মুনশিয়ানা মধুসূদনের এই রচনাটিকে সার্থক করে তুলেছে। শুধু তাই নয়-

            মধুসূদনের সনেটগুলি অনেক সময় প্রথাগত ইউরোপীয় সনেট থেকে কিছুটা আলাদা হলেও ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ কবিতাটিতে তিনি নিয়মনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। এখানে ভাবের আবেগ যেমন নিয়ন্ত্রিত, ছন্দের বাঁধুনিও তেমনই সুসংহত।

             পরিশেষে বলা যায় যে, গঠনশৈলী, অন্ত্যমিল বিন্যাস এবং ভাবপ্রকাশের সংহতি-সব দিক থেকেই ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ কবিতাটি একটি আদর্শ সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা হিসেবে সার্থকতা লাভ করেছে।তবে এটি কেবল বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, বরং বাংলা সনেটের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...