শিক্ষার সর্বাঙ্গীন বিকাশে মহাত্মাগান্ধী।।আধুনিক শিক্ষায় সর্বাঙ্গীন বিকাশের গুরুত্ব ও মহাত্মা গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করো।
শিক্ষার সর্বাঙ্গীন বিকাশে মহাত্মাগান্ধী।।আধুনিক শিক্ষায় সর্বাঙ্গীন বিকাশের গুরুত্ব ও মহাত্মা গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম সেমিস্টার এডুকেশন মাইনর।
আমরা জানি যে,শিক্ষার সর্বাঙ্গীন বিকাশের লক্ষ্যটিতে মহাত্মা গান্ধীর 'Basic Education' অর্থাৎ বুনিয়াদি শিক্ষা র নীতিটি সবিস্তার ব্যাখ্যা করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি "3R's" (Reading, Writing, Arithmetic)-এর পরিবর্তে "3H's"-এর ওপর জোর দিয়েছিলেন। যেখানে-Head (মস্তিষ্ক), যেটি মানসিক ও বৌদ্ধিক চিন্তার বিকাশ ঘটাতের সাহায্য করে,Heart (হৃদয়), প্রাক্ষোভিক, নৈতিক ও অনুভূতির বিকাশ ঘটায় Hand (হাত)যেটি দৈহিক কাজ ও বৃত্তিমূলক দক্ষতার বিকাশ ঘটায়। এছাড়াও-
কোঠারি কমিশন (১৯৬৪-৬৬) এবং ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020)-তেও শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক এবং ‘Holistic Education’ বা সমগ্রতাবাদী শিক্ষার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে।আর সেখানে-
আধুনিক শিক্ষায় সর্বাঙ্গীন বিকাশের অর্থঃ আধুনিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য কেবল তথ্য মুখস্থ করানো বা পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন নয়, বরং একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্বের সামগ্রিক উৎকর্ষ সাধন করা। সর্বাঙ্গীন বিকাশ বলতে বোঝায় শিশুর জন্মগত শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, আবেগিক এবং আধ্যাত্মিক বা নৈতিক ক্ষমতার সুষম ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশ। কোনো একটি দিক বাদ দিয়ে শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মহাত্মা গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গিতে সর্বাঙ্গীন বিকাশঃজাতির জনক মহাত্মা গান্ধী সর্বাঙ্গীন বিকাশের এক অনন্য সংজ্ঞা ও রূপরেখা দিয়ে গেছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তিটি হলো:
"Education is an all-round drawing out of the best in child and man—body, mind and spirit."
অর্থাৎ, শিক্ষা হলো শিশু তথা মানুষের দেহ, মন ও আত্মার মধ্যে নিহিত শ্রেষ্ঠ গুণগুলোর বহিঃপ্রকাশ। আর সেই বহিঃপ্রকাশে গান্ধীজির শিক্ষাদর্শনে সর্বাঙ্গীন বিকাশের মূল স্তম্ভগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-
•মস্তিষ্ক, হৃদয় ও হাতের সমন্বয়( Head, Heart and Hand):গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন প্রকৃত শিক্ষা কেবল মস্তিষ্কের (Intellect) বিকাশ ঘটায় না, এর সঙ্গে হৃদয়ের (Emotion/Morality) সংবেদনশীলতা এবং হাতের (Physical Skill/Labour) কর্মদক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে হয়। এই ত্রিমুখী সমন্বয়ই হলো সর্বাঙ্গীন বিকাশের মূল চাবিকাঠি।
শারীরিক বিকাশ ও শ্রমের মর্যাদাঃগান্ধীজি বুনিয়াদি শিক্ষায় (Basic Education / Wardha Scheme) শারীরিক সুস্থতা এবং কায়িক শ্রমের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলতেন, শারীরিক শ্রমহীন শিক্ষা পঙ্গু। হস্তশিল্প বা উৎপাদনমূলক কাজের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা কেবল স্বাবলম্বীই হয় না, তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুগঠিত ও কর্মক্ষম হয়।
মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশঃ মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ওপর জোর দিয়ে গান্ধীজি বলেছিলেন যে মাতৃভাষায় চিন্তা করা এবং প্রকাশ করা সবচেয়ে সহজ। এর ফলে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ দ্রুত ও স্বাভাবিকভাবে ঘটে।
নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশঃ গান্ধীজির মতে, চরিত্র গঠনহীন জ্ঞান বিষতুল্য। সত্য, অহিংসা, কর্তব্যপরায়ণতা, শৃঙ্খলা ও সর্বধর্ম সমন্বয়ের মতো নৈতিক গুণগুলো শিক্ষার্থীর চরিত্রের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা সর্বাঙ্গীন বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষায় সর্বাঙ্গীন বিকাশের গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা
মহাত্মা গান্ধীর এই সর্বাঙ্গীন বিকাশের দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিককালেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।আসলে এটি শিক্ষার্থীদের চাকরিপ্রার্থী না করে বরং আত্মনির্ভরশীল ও কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তাই সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য শিক্ষা সহজলভ্য ও গণমুখী করে তোলার ক্ষেত্রে এর জুড়ি নেই। আর সে কারণেই আধুনিক যুগে শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ ও অবক্ষয় রোধে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
পরিশেষে আমরা উপরিউক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলতে পারি যে, শিক্ষার কাজ কেবল তথ্য সরবরাহ করা বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সাহায্য করা নয়। যদি কোনো শিক্ষার্থী কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায় কিন্তু তার সামাজিকতা, নৈতিকতা বা দৈহিক বিকাশ না ঘটে, তবে সেই শিক্ষাকে কখনোই পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না।সুতরাং,-
একজন শিক্ষার্থীকে আদর্শ, সৎবিবেচক, কর্মক্ষম এবং সমাজের দরকারী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তার সুসংহত ও সর্বাঙ্গীন বিকাশ অত্যন্ত আবশ্যক। তাই এক কথায় বলা যায়- "শিক্ষার সর্ব প্রধান ও চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষের সর্বাঙ্গীন ও সুসংহত বিকাশ সাধন করা।"
Comments
Post a Comment