শিক্ষার সমস্যা।।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেররবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিক্ষার সমস্যা’ প্রবন্ধ ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট, শিক্ষাসংক্রান্ত ভাবনা—বিশেষ করে তাঁর প্রবন্ধগুলিতে (যেমন— ‘শিক্ষার হেরফের’, ‘শিক্ষা সংস্কার’, ‘শিক্ষার সমস্যা’ ইত্যাদি) উত্থাপিত শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি ও সমস্যাগুলির বিশ্লেষণ করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর।
আলোচনার শুরুতেই আমরা বলে রাখি যে,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঔপনিবেশিক শাসনকালের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল ত্রুটিপূর্ণই বলেননি, বরং তাকে এক ধরণের ‘কল কারখানা’ বা কেরানি তৈরির যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর ‘শিক্ষা’ প্রবন্ধগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রবন্ধে (বিশেষ করে ‘শিক্ষার হেরফের’ ও ‘শিক্ষার সমস্যা’ জাতীয় রচনাগুলিতে) তৎকালীন সমাজের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার যে নগ্ন চিত্র ও গভীর সংকট ফুটে উঠেছে, তা মূলত ঔপনিবেশিক কাঠামোর ফল।আসলে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন যে কীভাবে এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা বাঙালির প্রাণশক্তি ও সৃজনশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করছে।আর সেখানে আমরা দেখি-
শিক্ষা ব্যবস্থায় উত্থাপিত মূল সমস্যা ও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গিঃ প্রবন্ধকার রবীন্দ্রনাথ তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থার যে সমস্ত সংকট ও সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন, সেগুলির একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো-
ক. শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ভিনদেশি ভাষার প্রবর্তন:
- সমস্যা: ঔপনিবেশিক শাসনকালে শিক্ষার মাধ্যম ছিল ইংরেজি। মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ একটি ভিনদেশি ভাষায় শিক্ষাগ্রহণ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বুদ্ধির সিংহভাগ কেবল শব্দার্থ ও ব্যাকরণ আয়ত্ত করতেই ব্যয় হয়ে যেত। এর ফলে আসল জ্ঞানার্জন ব্যাহত হতো।
- রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি: রবীন্দ্রনাথ একে “না চিবাইয়া গিলিয়া খাওয়া”র সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, বিদেশী ভাষায় পঠনপাঠন চললে মনের মধ্যে কোনো সজীব ছবি বা অনুভূতির উদ্রেক হয় না। তাই শিক্ষার মাধ্যম অবশ্যই মাতৃভাষা হওয়া উচিত, যাতে ভাবনার সঙ্গে হৃদয়ের যোগসূত্র স্থাপিত হতে পারে।
খ. মুখস্থ বিদ্যা ও পুঁথিগত শিক্ষার কোপ:
- সমস্যা: তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ পরীক্ষাসর্বস্ব ও মুখস্থনির্ভর। শিক্ষার্থীরা না বুঝে বই মুখস্থ করে পাস করত এবং সমাজে কেবল কেরানি বা চাকুরিজীবী হিসেবে প্রবেশ করত।
- রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি: রবীন্দ্রনাথ এই ব্যবস্থাকে ‘চৌর্যবৃত্তি’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা বলেছেন। মুখস্থ বিদ্যার ফলে শিক্ষার্থীর বিচারবুদ্ধি, কল্পনাশক্তি ও চিন্তাশক্তি পঙ্গু হয়ে যায়। তিনি বলেন, “পড়িতে পড়িতে পড়িবার শক্তি অলক্ষিতভাবে বৃদ্ধি পাইতে থাকে”, কিন্তু মুখস্থ নির্ভর শিক্ষায় সেই অর্জিত শক্তি বা মননশীলতার বিকাশ ঘটে না।
গ. আনন্দহীন এবং যান্ত্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান:
- সমস্যা: ইস্কুলের চার দেওয়ালের বন্দিদশা, বেত্রাঘাত এবং অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাপে শিশুদের শৈশবের আনন্দ পুরোপুরি হারিয়ে যেত। শিক্ষার সঙ্গে জীবনের বা আনন্দের কোনো মেলবন্ধন ছিল না।
- রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি: রবীন্দ্রনাথের মতে, যে শিক্ষায় আনন্দ নেই, তা প্রকৃত শিক্ষা নয়। কৃত্রিম শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে শিশুদের প্রকৃতির উদার কোলে, গাছপালা ও খোলা আকাশের নিচে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আনন্দের মধ্য দিয়েই শিশুর মন ও প্রাণ প্রাকৃতিকভাবে বিকশিত হতে পারে।
ঘ. সমাজ ও জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা (পরগাছা শিক্ষা):
- সমস্যা: তৎকালীন স্কুল ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি দেশের মাটি, মানুষ ও পল্লীজীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। আধুনিক শিক্ষালয়গুলি সমাজজীবনে কোনো বাস্তব প্রভাব ফেলতে পারত না, এগুলোকে কবি ‘পরগাছা’ বলে অভিহিত করেছেন।
- রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি: শিক্ষাকে অবশ্যই কর্মমুখী ও জীবনঘনিষ্ঠ হতে হবে। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি কৃষি, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প এবং সমবায়ভিত্তিক পল্লীগঠনের কাজ শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার, যাতে শিক্ষার্থীরা আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।
ঙ. মানসিক দৈন্য ও আত্মপরিচয়ের সংকট:
- সমস্যা: পরাধীন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মনে নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি এক ধরনের হীনমন্যতা তৈরি করেছিল। এর ফলে শিক্ষার্থীরা আত্মসচেতনতার বদলে অন্ধভাবে পশ্চিমী অনুকরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
- রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি: এই মানসিক দৈন্য ঢাকण्यासाठी শিক্ষার্থীরা প্রায়ই আস্ফালন ও আড়ম্বরের আশ্রয় নেয়। কবি চেয়ে এমন এক স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে যা মানুষকে শুধু তথ্য বা সার্টিফিকেট দেবে না, বরং তার আত্মাকে মুক্ত করবে এবং বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করবে।
৩. উপসংহার
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনা নিছক কোনো কাল্পনিক দর্শন ছিল না, বরং সমসাময়িক শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংকট থেকে উত্তরণের এক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা। তাঁর মতে, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আগে মনের মুক্তি প্রয়োজন, আর সেই মুক্তির চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে এক ত্রুটিমুক্ত, মাতৃভাষানির্ভর, আনন্দময় ও জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে।
--- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষাদর্শ, শিক্ষার লক্ষ্য এবং পাঠ্যক্রম সংক্রান্ত ভাবনা এই ভিডিওটির আলোচনা থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘শিক্ষার হেরফের’ ও ‘শিক্ষার সমস্যা’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারবেন।
Comments
Post a Comment