Skip to main content

ভারতীয় রাজনীতিতে মন্ডল কমিশনের সুপারিশ ও তার প্রভাব আলোচনা করো।

ভারতীয় রাজনীতিতে সমস্যাসমূহ।।ভারতীয় রাজনীতিতে মন্ডল কমিশনের সুপারিশ ও তার প্রভাব আলোচনা করো।পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সপ্তম সেমিস্টার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মাইনর।

      আমরা জানি যে,স্বাধীন ভারতে অনগ্রসর শ্রেণীর (OBC) সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে মন্ডল কমিশন এক যুগান্তকারী অধ্যায়।আর সেখানে আমারা দেখতে পাই- ১৯৭৯ সালে মোরারজী দেশাই সরকারের আমলে বি. পি. মন্ডলের নেতৃত্বে 'দ্বিতীয় অনগ্রসর শ্রেণী কমিশন' গঠিত হয়, যা সাধারণত মন্ডল কমিশন নামে পরিচিত।যে কমিশন ১৯৮০ সালে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে এবং ১৯৯০-এর দশকে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং সরকারের আমলে এই কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা হয়। আর সেখানে-

       •মন্ডল কমিশনের প্রধান সুপারিশসমূহ। মন্ডল কমিশন তাদের রিপোর্টে ভারতের সমাজকে পর্যালোচনা করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছিল। আর সেই সুপারিশগুলো নিম্নসূত্রাকারে আলোচনা করা হলো-

      •সংরক্ষণ বৃদ্ধি। সমাজের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী বা OBC-দের জন্য সরকারি চাকরি এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়।যার ফলে তফশিলি জাতি (SC) ও তফশিলি উপজাতি (ST)-দের বর্তমান ২২.৫ শতাংশ সংরক্ষণের সঙ্গে যোগ হয়ে মোট সংরক্ষণের হার ৪৯.৫ শতাংশে পৌঁছায়।

     •শনাক্তকরণ। কমিশন সমগ্র দেশে মোট ৩৭৪৩ টি জাতিকে 'সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণী' বা OBC হিসেবে চিহ্নিত করে, যা দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫২ শতাংশ ছিল।

      অন্যান্য কল্যাণমূলক পদক্ষেপ। অনগ্রসর শ্রেণীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সহজ শর্তে ঋণদান, কুটির শিল্পের বিকাশ, জমি সংস্কার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ বৃদ্ধির কথা বলা হয়।

     •ভারতীয় রাজনীতিতে মন্ডল কমিশনের প্রভাব।১৯৯০ সালে ভিপি সিং সরকার মন্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার ঘোষণা করলে ভারতের রাজনীতিতে এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয় যার ফলে এর বহুমুখী প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আর সেই প্রভাব গুলি হলো-

   ওবিসি রাজনীতির উত্থান। মন্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ফলে ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন শক্তির উত্থান ঘটে, যাকে 'মন্ডল রাজনীতি' বা 'দ্বিতীয় গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান' বলা হয়। উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও অন্যান্য রাজ্যে লালু প্রসাদ যাদব, মুলায়ম সিং যাদব, নীতীশ কুমারের মতো ওবিসি নেতাদের রাজনৈতিক দলগুলি যেমন-জনতা দল, সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল উত্থান ঘটে।

      •উচ্চবর্ণের প্রতিক্রিয়া ও কমণ্ডল রাজনীতি। সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের বিরোধিতায় দেশের উচ্চবর্ণের যুবসমাজ তীব্র আন্দোলন ও আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে পাল্টা মেরুকরণ তৈরি করতে হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি রাম জন্মভূমি আন্দোলন বা 'কমণ্ডল' রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসে, যা ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দেয়।

      সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।এই সুপারিশের ফলে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বহু পিছিয়ে পড়া মানুষ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পায়। সমাজে নিচুতলার মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মমর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

      •দলীয় সমীকরণের পরিবর্তন। ভারতের জাতীয় দলগুলি (বিশেষ করে কংগ্রেস এবং পরবর্তীকালে বিজেপি) বুঝতে পারে যে ওবিসি ভোটব্যাংক ছাড়া জয়লাভ অসম্ভব। এর ফলে পরবর্তীতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলই অনগ্রসর শ্রেণীকে নিজেদের দিকে টানতে বাধ্য হয়।

       পরিশেষে বলতে পারি যে,মন্ডল কমিশন কেবলমাত্র সরকারি চাকরি বা শিক্ষায় সংরক্ষণের জন্য নয়, এটি ছিল ভারতের ক্ষমতার কাঠামোতে সামাজিক ন্যায়ের এক সুদূরপ্রসারী দাবি।এর প্রভাবে ভারতীয় রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে জাতভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক সমতার এক নতুন রূপ লাভ করে। শুধু তাই নয় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এই কমিশন।

ঠিক এরূপ অসংখ্য বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ব্যাখ্যা সাজেশন এবং টিউটোরিয়াল ক্লাসের ভিডিও পেতে ভিজিট করুন আমাদের SHESHER KOBITA SUNDARBAN Youtube channel 🙏 Samaresh Sir Hingalganj North 24 Parganas.

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...