Skip to main content

 শিক্ষা সংস্কার প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা সংস্কারের ভাবনার দিকগুলি আলোচনা করো।

পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজর।

উপযুক্ত তথ্য সহকারে নোটসটি দিবেন



পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় (West Bengal State University) পঞ্চম সেমিস্টার বাংলা মেজরের পরীক্ষার্থীদের জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিক্ষা সংস্কার’ প্রবন্ধের ওপর একটি উপযুক্ত ও নম্বর-মুখী নোটস নিচে প্রস্তুত করা হলো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিক্ষা সংস্কার’ প্রবন্ধ ও শিক্ষাভাবনা

১. প্রস্তাবনা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল সাহিত্যের বরপুত্র নন, একাধারে তিনি ছিলেন দূরদর্শী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাগুরু। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনকালে দেশের প্রচলিত যান্ত্রিক, ত্রুটিপূর্ণ ও কেরানি তৈরির শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ‘শিক্ষা’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘শিক্ষা সংস্কার’ (ভাণ্ডার, আষাঢ় ১৩১৩) প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত শিক্ষা তখনই সার্থক হয় যখন তা মানুষের মননকে মুক্ত করে এবং দেশের মাটি ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকে।

২. ‘শিক্ষা সংস্কার’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনার মূল দিকগুলি

প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করার পাশাপাশি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কারের প্রস্তাব রেখেছেন। নিচে তাঁর ভাবনার প্রধান দিকগুলি আলোচনা করা হলো:

ক. শিক্ষার বাহন ও মাতৃভাষার গুরুত্ব:

রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন যে, শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো ভিনদেশি ভাষা (ইংরেজি) দিয়ে শিক্ষাদান। বিদেশি ভাষার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর মেধার பெரும்ப অংশ কেবল ভাষা আয়ত্ত করতেই ব্যয় হয়ে যায়, ফলে আসল শিক্ষা ব্যাহত হয়।

  • সংস্কার প্রস্তাব: মাতৃভাষার মাধ্যমেই প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রদান করতে হবে। বিদেশি ভাষার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের মগজকে পঙ্গু করার ঘোরবিরোধী ছিলেন তিনি। বাংলার পাঠ্যগ্রন্থ ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই বাঙালির ছেলেকে প্রকৃত মানুষ হতে হবে।

খ. পুঁথিগত বিদ্যা ও মুখস্থ বিদ্যার বিরোধিতা:

তৎকালীন শিক্ষাব্যবস্থা ছিল মূলত পরীক্ষা সর্বস্ব এবং পুঁথিগত। যেখানে নোট মুখস্থ করে পাস করাকেই শিক্ষার চরম লক্ষ্য বলে মনে করা হতো। রবীন্দ্রনাথ একে ‘চৌর্যবৃত্তি’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা বলে অভিহিত করেছেন।

  • সংস্কার প্রস্তাব: মুখস্থ করার প্রবণতা দূর করে শিক্ষার্থীর মধ্যে বিচারবুদ্ধি, সৃজনশীলতা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা জাগিয়ে তুলতে হবে। পুথিগত পড়ার পাশাপাশি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সজীব মানুষের সান্নিধ্য লাভ করা শিক্ষার অঙ্গ হওয়া উচিত।

গ. প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ ও মুক্ত পরিবেশ:

রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, কৃত্রিম শ্রেণিকক্ষ বা চার দেওয়ালের বন্দিদশা শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের অন্তরায়। প্রকৃতির কোলে মুক্ত বাতাসে শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠা জরুরি।

  • সংস্কার প্রস্তাব: যন্ত্রসর্বস্ব পড়াশোনার বদলে গাছপালা, খোলা আকাশ, নির্মল বাতাস এবং উদার প্রাকৃতিক দৃশ্যের সান্নিধ্যকে তিনি শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠায় তাঁর এই ভাবনার বাস্তব রূপায়ন ঘটেছিল।

ঘ. জীবনমুখী ও কর্মভিত্তিক শিক্ষা:

দেশের সাধারণ মানুষ এবং পল্লী অঞ্চলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে তিনি ‘পরগাছা’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন। তাঁর মতে, যে শিক্ষা মানুষের কর্মজীবন ও অন্নসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত নয়, তার কোনো সামাজিক মূল্য নেই।

  • সংস্কার প্রস্তাব: শিক্ষাকে সমাজ ও পল্লী জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি কৃষি, হস্তশিল্প, এবং নান্দনিক শিল্পকলার চর্চা শিক্ষার অঙ্গীভূত হওয়া দরকার, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তবমুখী ও আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।

ঙ. শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্কের রূপান্তর:

শিক্ষা দান ও গ্রহণের প্রক্রিয়াটি কোনো যান্ত্রিক বা ব্যবসায়িক চুক্তি নয়। শিক্ষক এবং ছাত্রের মধ্যে একটি আত্মিক বা আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকা আবশ্যক।

  • সংস্কার প্রস্তাব: শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক ও বন্ধুস্থানীয়। যেখানে ভক্তি ও স্নেহের সেতুবন্ধন থাকবে, সেখানেই প্রকৃত জ্ঞান বিকশিত হতে পারে। প্রণালীর চেয়ে শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও আন্তরিকতাই শিক্ষার মান নির্ধারণ করে।

৩. উপসংহার

রবীন্দ্রনাথের ‘শিক্ষা সংস্কার’ প্রবন্ধের মূল সুরটি হলো ‘স্বদেশিয়ানা ও বিশ্বমানকতার সমন্বয়’। তিনি এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন যা মানুষকে অন্ধ অনুকরণকারী না বানিয়ে স্বাধীনচেতা, সৃজনশীল এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। আজকের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় মূল্যবোধ ও কর্মমুখী শিক্ষার যে সংকট দেখা দিয়েছে, তাতে রবীন্দ্র-শিক্ষাদর্শের প্রাসঙ্গিকতা আজও অপরিসীম।

--- বিইউ পিইপি পঞ্চম সেমিস্টার মেজর এডুকেশন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে শিক্ষার লক্ষ্য ও পাঠ্যক্রম কেমন হওয়া উচিত? এই ভিডিওটি দেখলে রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ, শিক্ষার লক্ষ্য এবং পাঠ্যক্রম সংক্রান্ত ভাবনাগুলি আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে সুবিধা হবে।

Comments

Popular posts from this blog

একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়।

  একটি সার্থক গীতিকাব্যের পরিচয়-সারদা মঙ্গল               গীতিকাব্য হলো এক ধরনের কবিতা, যার মধ্যে দিয়ে ব্যক্তির আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাগুলিকে ছন্দ ওর সংগীতের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। তবে এখানে কবিতাগুলি খুবই ছোট আকারের হয়, আর সেখানে কবির ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। আর এই প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি গীতি কবিতার সংকলন হলো গীতিকাব্য। ব্যঞ্জনাময় ও সংহত ।  গীতিকাব্যের বৈশিষ্ট্য  গীতিকাব্যের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো: ১. ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগ প্রকাশ: এটি গীতিকাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে কবি নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আনন্দ বা বিষাদের কথা তুলে ধরেন। ২. সংক্ষিপ্ততা: গীতিকাব্য সাধারণত দীর্ঘ হয় না। অল্প কয়েকটি স্তবকের মধ্যে কবি তাঁর ভাবনা সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করেন। ৩. সুর ও ছন্দের প্রাধান্য: গীতিকাব্য মূলত সুর করে আবৃত্তি করার জন্য রচিত হয়। তাই এতে সুর ও ছন্দের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। ৪. আত্মগতভাব: গীতিকাব্যে বাইরের জগতের বর্ণনা না দিয়ে কবির নিজের মনের ভেতরের জগতের প্রতি মনোযোগ ...

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর ।

পঞ্চম সেমিস্টার ইতিহাস মাইনর সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর  ১) শিল্প বিপ্লব কবে কোথায় প্রথম ঘটেছিল?         উত্তর - প্রথম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল ইংল্যান্ডে (গ্রেট ব্রিটেন)। এটি প্রধানত অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়ে প্রায় ১৭৬০ থেকে ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দ-এর মধ্যে ঘটেছিল। ২) কৃষ্ণমৃত্যু কী?            • কৃষ্ণমৃত্যু (Black Death) হলো মানব ইতিহাসের এক ভয়াবহ মহামারি।এটি ছিল মূলত প্লেগ (Plague) রোগ, যা Yersinia pestis নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল।এটি প্রধানত ১৩৪৬ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া (ইউরেশিয়া) এবং উত্তর আফ্রিকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩) কে বলেছিলেন মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড?        •এই বিখ্যাত উক্তিটি যিনি করেছিলেন তিনি হলেন প্রাচীন গ্রিসের একজন প্রখ্যাত দার্শনিক, যার নাম প্রোটাগোরাস (Protagoras)।তাঁর মূল বক্তব্যটি ছিল-"মানুষই সবকিছুর মানদণ্ড, যা আছে তারও, আর যা নেই তারও।” ৪) পেত্রাক কেন বিখ্যাত?         •পেত্রাক (Francesco Petrarca) ছিলেন ১৪ শতকের (১৩০৪-১৩৭৪) একজন ...

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো।

টপ্পা গান। বাংলা টপ্পা গানের বৈশিষ্ট্য আলোচনা করে এই ধারায় নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত)-র অবদান সংক্ষেপে আলোচনা করো। পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা মাইনর প্রথম সেমিস্টার ইউনিট ৩।            আমরা জানি যে,অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক 'যুগসন্ধিকাল'। এই সময়ে মধ্যযুগীয় দেব-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংগীতে প্রথম নাগরিক ও মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে। এই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল হলো 'টপ্পা গান'। মূলত পাঞ্জাবের উটচালকদের লোকগীতি থেকে উৎপন্ন এই ধারাটিকে বাংলা মার্গসংগীত বা উচ্চাঙ্গসংগীতের আঙিনায় জনপ্রিয় করে তোলেন রামনিধি গুপ্ত, যিনি বাঙালির কাছে আদর করে 'নিধুবাবু' নামে পরিচিত ছিলেন।     ১. টপ্পা গানের উৎপত্তি ও স্বরূপঃ  'টপ্পা' শব্দটির মূল উৎস হিন্দি 'তপনা' বা 'টপকা' শব্দ থেকে, যার অর্থ 'লাফ দেওয়া' বা 'সংক্ষিপ্ত'। রাধামোহন সেন তাঁর 'সঙ্গীততরঙ্গ' গ্রন্থে লিখেছেন- "পাঞ্জাব হইতে হইল টপ্পার জনম / দুই চরণের মধ্যে তাহার নিয়ম।"       আসলে জনশ্রুতি অনুযায়...